দুর্নীতির অভিযোগে আমলাতন্ত্রে অস্বস্তি: প্রশ্নের মুখে প্রশাসন, পুনর্নিয়োগ বিতর্কে নতুন মাত্রা
নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, দুরন্ত টিভি:
রাজ্যের শীর্ষ প্রশাসনিক মহলে দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। বিরোধী দলনেতার প্রকাশ্যে তোলা অভিযোগের পর প্রশাসনের একাংশের প্রতিক্রিয়া, অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের পুনর্নিয়োগ নিয়ে পাল্টা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা এবং সচিবালয়ে সাংবাদিক সম্মেলন—সব মিলিয়ে একের পর এক প্রশ্নের মুখে পড়েছে প্রশাসনিক শিষ্টাচার ও জবাবদিহিতা।
বিধানসভায় নিজ কক্ষে সাংবাদিক সম্মেলন করে বিরোধী দলনেতা জিতেন্দ্র চৌধুরী তথ্য জানার অধিকার (আরটিআই) আইনে প্রাপ্ত নথির ভিত্তিতে কয়েকজন শীর্ষ আমলার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদের অভিযোগ তোলেন। তাঁর বক্তব্যে অবসরপ্রাপ্ত আইএএস আধিকারিক প্রদীপ চক্রবর্তী ও অনিন্দ্য ভট্টাচার্যের নাম বিশেষভাবে উঠে আসে। পাশাপাশি, বিভিন্ন অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিকের ধারাবাহিক পুনর্নিয়োগের বিষয়ও তিনি সামনে আনেন। যদিও তিনি স্বীকার করেন, পুনর্নিয়োগের সংস্কৃতি আগের সরকারগুলির আমলেও ছিল।

অভিযোগের পরপরই দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দেয়। প্রথমত, সচিব প্রদীপ চক্রবর্তী সচিবালয়ে নিজের দপ্তরে সাংবাদিকদের ডেকে বিরোধী দলনেতার তোলা অভিযোগের জবাব দেন। তাঁর বক্তব্যে তিনি ১৩টি অভিযোগের মধ্যে দুটি অভিযোগ অস্বীকার করেন। এই মন্তব্য ঘিরেই নতুন প্রশ্ন উঠেছে—যদি মাত্র দুটি অভিযোগই খণ্ডন করা হয়, তবে বাকি অভিযোগগুলির অবস্থান কী?

দ্বিতীয়ত, বিজেপির রাজ্য মুখপাত্র নবেন্দু ভট্টাচার্য সাংবাদিক সম্মেলনে দাবি করেন, অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিকদের পুনর্নিয়োগ কোনও নতুন ঘটনা নয়; বাম আমলেও এই প্রথা চালু ছিল। তাঁর বক্তব্যে পুনর্নিয়োগের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উঠে এলেও বিরোধী দলনেতার মূল অভিযোগ—দুর্নীতি—নিয়ে সরাসরি বিশদ প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি বলেই রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত।

এই ঘটনাপ্রবাহের পর জনমনে একাধিক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রশাসনের একজন শীর্ষ সচিব কি কোনও রাজনৈতিক নেতার অভিযোগের জবাব সরাসরি সচিবালয়ের কক্ষ থেকে দেওয়া সমীচীন? যদি অভিযোগ প্রশাসনের বিরুদ্ধে হয়, তবে তার জবাব কি নির্ধারিত সরকারি ব্যবস্থার মাধ্যমেই আসা উচিত ছিল না? আবার অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেই যখন ব্যাখ্যা দেন, তখন সেই ব্যাখ্যার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
এছাড়া, দুর্নীতির অভিযোগের মূল প্রসঙ্গ থেকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু কি পুনর্নিয়োগ বিতর্কের দিকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে—এমন প্রশ্নও তুলছেন অনেকেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণ মানুষের কাছে মূল ইস্যু পুনর্নিয়োগ নয়; বরং অভিযোগের সত্যতা, স্বচ্ছ তদন্ত এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা।
এই প্রেক্ষাপটে অতীতের একটি বহুল আলোচিত ঘটনারও উল্লেখ ফের সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ত্রিপুরা সফরের জন্য সরকারি অর্থে তৈরি একটি বিশেষ খাট পরে এক আমলার ব্যক্তিগত দখলে চলে যায়। যদিও এই অভিযোগের সরকারি নিষ্পত্তি বা পুনরুদ্ধারের কোনও তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি, তবুও বিষয়টি আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে প্রশাসনিক সম্পদের ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতা নিয়ে।

এখন নজর প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। বিরোধী দলনেতার অভিযোগের বিষয়ে সরকার বা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি আনুষ্ঠানিক তদন্তের পথে হাঁটবে কি না, নাকি বিতর্ক রাজনৈতিক বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে—সেই উত্তরই খুঁজছে রাজ্যবাসী।
