মণিপুরে অসম রাইফেলসের কনভয়ে ভয়াবহ জঙ্গি হামলা, শহিদ ২ জওয়ান


নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা/ইম্ফল: মণিপুরের উখরুল (Ukhrul) জেলায় অসম রাইফেলসের কনভয় লক্ষ্য করে ভয়াবহ ও সুপরিকল্পিত অতর্কিত হামলা চালাল অজ্ঞাতপরিচয় বন্দুকধারীরা। গত সোমবার (৬ জুলাই) দুপুরে ঘটে যাওয়া এই নৃশংস হামলায় অসম রাইফেলসের দুই বীর জওয়ান শহিদ হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এই প্রতিবেশী রাজ্যে নতুন করে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।


সেতু পার হতেই আইইডি বিস্ফোরণ, তারপর ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি
নিরাপত্তা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, সোমবার আনুমানিক দুপুর ১টা ৩০ থেকে ২টোর মধ্যে উখরুল জেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে, ২০২ নম্বর জাতীয় সড়কে (NH-202) নুংশাং খং এলাকার একটি সেতুর কাছে এই হামলার ঘটনা ঘটে। ৪০ নম্বর অসম রাইফেলসের একটি দল উখরুল সদর দপ্তর থেকে তাদের শাংশাক (Shangshak) ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরের দিকে কনভয় নিয়ে ফিরছিল।
হামলাটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। দুষ্কৃতীরা রাস্তার ওই সেতুর দু’পাশে তিনটি শক্তিশালী আইইডি (IED) পুঁতে রেখেছিল। কনভয়টি সেতুতে উঠতেই পরপর দুটি বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। বিস্ফোরণের তীব্রতায় কেঁপে ওঠে গোটা এলাকা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই চারপাশের পাহাড় ও জঙ্গল থেকে কনভয় লক্ষ্য করে ভারী অস্ত্র থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছুড়তে শুরু করে বন্দুকধারীরা। অতর্কিত এই হামলার মুখে পড়লেও দমে যাননি অসম রাইফেলসের জওয়ানেরা। তাঁরাও দ্রুত পজিশন নিয়ে পাল্টা জবাব দেন। দু’পক্ষের মধ্যে প্রায় এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তীব্র গুলির লড়াই চলে।
শহিদ দুই বীর জওয়ান
এই কাপুরুষোচিত হামলায় ঘটনাস্থলেই শহিদ হন অসম রাইফেলসের দুই জওয়ান। তাঁরা হলেন— ওয়ারেন্ট অফিসার বলবন্ত সিং (Warrant Officer Balwant Singh) এবং রাইফেলম্যান সি এম সিং (Rifleman C.M. Singh)। শহিদ সি এম সিং ঘটনার সময় কনভয়ের একটি গাড়ির চালকের আসনে ছিলেন বলে জানা গেছে। আহত জওয়ানদের দ্রুত উদ্ধার করে প্রথমে শাংশাকের অসম রাইফেলস ক্যাম্পে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সামরিক হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছে।


জঙ্গলে চিরুনি তল্লাশি, উদ্ধার অবিস্ফোরিত আইইডি
ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই উখরুল থেকে অতিরিক্ত সেনা, অসম রাইফেলস এবং মণিপুর পুলিশের বিশাল বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। গোটা এলাকা কর্ডন বা অবরুদ্ধ করে শুরু হয়েছে ব্যাপক চিরুনি তল্লাশি (Combing Operation)। ওই পাহাড়ি ও জঙ্গল ঘেরা অঞ্চলে ড্রোনের সাহায্য নিয়েও হামলাকারীদের খোঁজে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। এদিকে তল্লাশি অভিযান চলাকালীন দুর্ঘটনাস্থলের কাছ থেকেই আরও একটি অবিস্ফোরিত শক্তিশালী আইইডি উদ্ধার করেছে নিরাপত্তা বাহিনীর বোম্ব স্কোয়াড। ফলে আরও একটি বড়সড় দুর্ঘটনা এড়ানো গেছে।
নেপথ্যে কারা? জারি ধোঁয়াশা
এখনও পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট জঙ্গি সংগঠন এই হামলার দায় স্বীকার করেনি। তবে গোয়েন্দা ও স্থানীয় সূত্রের অনুমান, নাগা জঙ্গি সংগঠন NSCN (IM)-এর একটি দলছুট অংশ (Eastern Flank faction) এই ঘটনার নেপথ্যে থাকতে পারে। যদিও NSCN (IM)-এর পক্ষ থেকে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই হামলায় তাদের যুক্ত থাকার খবর সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়েছে।
তীব্র নিন্দা মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্যপালের
এই নৃশংস হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন মণিপুরের রাজ্যপাল অজয় কুমার ভাল্লা এবং মুখ্যমন্ত্রী সুযম্নম খেমচান্দ সিং। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, “শান্তি বিঘ্নিত করার এই কাপুরুষোচিত চেষ্টা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। দোষীদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় এনে কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত করবে সরকার।” শহিদ জওয়ানদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন অসম রাইফেলসের উচ্চপদস্থ কর্তারাও। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত উখরুল ও সংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় কড়া সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!