ত্রিপুরার সরকারি কোষাগারে ‘রহস্যময়’ ছিদ্র—দায় কার?
নিজস্ব প্রতিবেদক | দুরন্ত টিভি | আগরতলা
ত্রিপুরা সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় এক ভয়াবহ বিশৃঙ্খলার চিত্র উঠে এসেছে কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (CAG)-এর ২০২৩-২৪ সালের স্টেট ফাইন্যান্স অডিট রিপোর্টে। রাজ্যের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ শত শত কোটি টাকা সরকারি কোষাগারের (কনসলিডেটেড ফান্ড) বাইরে, বিভিন্ন ব্যক্তিগত বা অননুমোদিত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়ে আছে। প্রশ্ন উঠেছে, রাজ্যের অর্থ দপ্তরের অভিভাবক যখন নিজে একই পদে দীর্ঘ বছর ধরে আসীন, তখন এই ‘আর্থিক অনাচার’ কি নিছক অকর্মণ্যতা, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো বড়সড় সিন্ডিকেট?
হিসাবের বাইরে শত শত কোটি টাকা, CAG-এর রিপোর্টে দেখা গেছে, ৩১ মার্চ ২০২৪ পর্যন্ত ৬৭৪ জন ড্রয়িং অ্যান্ড ডিসবার্সিং অফিসার (DDO)-এর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৫৫৪.১৬ কোটি টাকা জমা পড়ে আছে। অথচ এই ব্যয়ের হিসাব ইতিপূর্বেই সরকারি কোষাগার থেকে ‘বুক’ করা হয়েছে। এর চেয়েও উদ্বেগজনক হলো, ৪৪টি অননুমোদিত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১৮.০২ কোটি টাকা রাখা হয়েছে অর্থ দপ্তরের কোনো প্রকার অনুমোদন ছাড়াই। সংবিধানের ২৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সরকারি প্রতিটি পয়সা ট্রেজারি নিয়ম মেনে চলার কথা। কিন্তু ত্রিপুরায় যেন সরকারি অর্থ পরিচালনার ক্ষেত্রে এক সমান্তরাল ‘অঘোষিত রাজত্ব’ চলছে।
ত্রিপুরার আর্থিক প্রশাসনের ইতিহাসে সাম্প্রতিক CAG রিপোর্ট সম্ভবত সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলোর একটি সামনে এনে দিয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী ব্যয় দেখানো হয়েছে, অথচ একই সময়ে শত শত কোটি টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কেবল প্রশাসনিক ত্রুটি বলে কি এত বড় ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব?


এই গোটা সময়কালে অর্থ দপ্তরের অতিরিক্ত সচিব এবং রাজ্যের ট্রেজারি ডাইরেক্টর—উভয় গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন রয়েছেন আকিঞ্চন সরকার। আর্থিক শৃঙ্খলার মূল চাবিকাঠি যখন একজনের হাতে, তখন এই অব্যবস্থাপনার দায় তিনি কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না। ১৭ জন DDO অর্থ দপ্তরের চোখ ফাঁকি দিয়ে ২.২২ কোটি টাকা গোপন করে রাখল, আর দপ্তরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে বসেও আকিঞ্চন সরকার তা টের পেলেন না? নাকি টের পেয়েও নীরব রইলেন?
এই পুরো সময়কালে অর্থ দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিলেন আকিঞ্চন সরকার। একদিকে অর্থ দপ্তরের অতিরিক্ত সচিব, অন্যদিকে ট্রেজারিজ দপ্তরের ডিরেক্টর—দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক পদে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, CAG যে গুরুতর নিয়ন্ত্রণগত ব্যর্থতার ছবি তুলে ধরেছে, তার জন্য প্রশাসনিকভাবে জবাবদিহি করবেন কে?

ঋণভার বাড়ছে, অথচ টাকা পড়ে আছে অলস একাউন্টে। শুধু এই টাকা নয়, আরো কয়েকশ কোটি টাকার গল্প আছে। সবচেয়ে বড় বিদ্রুপ হলো, রাজ্য সরকার যখন বিভিন্ন প্রকল্পের উন্নয়নের দোহাই দিয়ে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিচ্ছে এবং সেই ঋণের সুদ গুণতে হচ্ছে রাজ্যবাসীকে, ঠিক তখনই সরকারি দপ্তরের শত শত কোটি টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অলস ভাবে পড়ে আছে। এই টাকা সরকারি কোষাগারে থাকলে সরকারকে নতুন করে ঋণ নিতে হতো না। তাহলে সাধারণ মানুষের ওপর এই ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার পেছনে আসল উদ্দেশ্য কী?
সরকার নীরব কেন?
নিয়ম অনুযায়ী, ২০১৭ সালেই এই ধরনের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার নির্দেশ ছিল। কিন্তু কেন সেই নির্দেশ কার্যকর হলো না? কেন ২০২০ সালে পুনরায় চালু হলো ঐ অনুমোদন হীন একাউন্ট গুলো? সেই একাউন্টে রয়েছে গোপন কয়েক কোটি টাকা। কেন আকিঞ্চন সরকারের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক গাফিলতি বা আর্থিক অসংগতির জন্য কোনো বিভাগীয় তদন্ত হলো না? জনমনে এখন জোর গুঞ্জন—মহাকরণের অলিন্দে কি আকিঞ্চন সরকারের সাথে জড়িয়ে আছেন আরও বড় কোনো ‘রাঘব-বোয়াল’? সেই প্রভাবশালী ব্যক্তিদের রক্ষা করতেই কি আকিঞ্চন সরকারকে আড়াল করে রাখা হচ্ছে?

সরকারি কোষাগারের বাইরে টাকা রাখা আর্থিক কারসাজি, দ্বৈত বুকিং এবং তছরুপের পথ প্রশস্ত করে। অডিট রিপোর্টে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, রাজ্যের ব্যয়ের রেকর্ডের সত্যতা এখন আর প্রত্যয়ন করা সম্ভব নয়। এটি কেবল নিয়ম লঙ্ঘন নয়, এটি রাজ্যের আর্থিক সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত। সরকার কি এই অডিটের gভিত্তিতে ব্যবস্থা নেবে, নাকি এই আর্থিক কেলেঙ্কারির দায়ভার পুরো মন্ত্রিসভার ওপর বর্তাবে—এখন সেটাই দেখার বিষয়।
মানুষের করের টাকার এমন যথেচ্ছ ব্যবহারে আজ জবাবদিহিতা দাবি করছে ত্রিপুরাবাসী। প্রশাসন কি তবে অন্ধ? নাকি অন্ধ সেজে থাকার কোনো বিশেষ প্রয়োজন আছে?

এই গোটা সময়কালটাই (The Whole Period) একাধারে অর্থ দপ্তরের অতিরিক্ত সচিব এবং অন্যদিকে ত্রিপুরা রাজ্যের ট্রেজারী ডাইরেক্টর ছিলেন (এবং এখনো আছেন) আকিঞ্চন সরকার। তাহলে এতেসব ঘটনার দায় কার? কার অপদার্থতা? কার দায়িত্ব পালনে অবহেলা? কেন তিনি এতোসবের পরেও সরকারিভাবে জবাবদিহির আওতায় এলেন না? কেনই বা সরকার কর্তব্য পালনে মারাত্মক গাফিলতি ও অবহেলার জন্য আকিঞ্চন সরকারের বিরুদ্ধে উপযুক্ত বিভাগীয় এবং আইনী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে না? তাহলে কি রহস্যের জাল আরও গভীরে কোথাও লুকানো আছে? মহাকরণে আকিঞ্চন এণ্ড কোং-এ কি তাহলে আরও অনেক তাবড়-তাবড় রুই-কাৎলা-রাঘব বোয়ালরাও জড়িয়ে আছেন?! তাই কি নিজেদের বিপদ নিজেরাই ডেকে না আনার কৌশল হিসাবেই আকিঞ্চনকে এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখা হয়েছে? প্রশ্ন কিন্তু ইতিমধ্যেই উঠে গেছে।

এর দায় সম্পূর্ণ ভাবে রাজ্য অর্থ দপ্তরের হর্তাকর্তা ও রাজ্যের ট্রেজারী ডাইরেক্টর আকিঞ্চন সরকারেরই। একা দীর্ঘবছর যাবত দুইটি পোস্ট দখল করে বসে আছেন, আর তার এই দুই দপ্তরের অকর্মণ্যতার দরুনই রাজ্যের মানুষের কল্যানের জন্য উদ্দেশ্য করা শত শত কোটি টাকার জলাঞ্জলি। রাজ্যবাসীর এই ক্ষতির দায় আকিঞ্চনকেই নিতে হবে। সরকার ব্যবস্থা নিক। এখন দেখার কোথাকার জল শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।
