নিজস্ব প্রতিনিধি, দুরন্ত টিভি, আগরতলা:
ত্রিপুরার সরকারি ও সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত বিদ্যালয়গুলিতে দীর্ঘদিন ধরে এক গুরুতর প্রশাসনিক উদাসীনতার অভিযোগ সামনে আসছে। প্রশ্ন উঠছে, শিক্ষা দপ্তরের নিজস্ব নির্দেশিকা ও মেমো যদি কার্যকরই না হয়, তাহলে সেই নির্দেশ জারি করার উদ্দেশ্য কী ছিল?
২০১৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর মাধ্যমিক শিক্ষা অধিকর্তার কার্যালয়ের (Estt. Confirmation Section) জারি করা Memo No. F.3(P-63)-SE-E(Conf.)/2018-এ রাজ্যের সমস্ত জেলা শিক্ষা আধিকারিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এমন শিক্ষকদের তথ্য সংগ্রহ করতে, যারা চাকরিতে কর্মরত অবস্থায় উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন করেছেন কিন্তু সেই যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রাপ্য উচ্চতর বেতনস্কেল বা সুবিধা পাননি।
মেমোতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে, সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের নাম, যোগদানের তারিখ, উচ্চতর যোগ্যতা অর্জনের তারিখ, তৎকালীন বেতন এবং বর্তমান বেতনের তথ্য ১৫ দিনের মধ্যে শিক্ষা অধিকর্তার কার্যালয়ে পাঠাতে হবে। অর্থাৎ সরকার নিজেই স্বীকার করেছিল যে উচ্চশিক্ষিত শিক্ষকদের একটি বড় অংশ তাদের প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

২০১৯ সালে জারি হওয়া নোটিশ
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তারপর কী হলো?
শিক্ষক মহলের অভিযোগ, বহু শিক্ষক চাকরিতে যোগদানের দিন থেকেই প্রয়োজনীয় উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও যোগ্যতা অনুযায়ী প্রাপ্য পদের পরিবর্তে নিম্নপদে চাকরি করছেন। অনেকে চাকরিরত অবস্থায় বিএডসহ অন্যান্য উচ্চতর ডিগ্রিও অর্জন করেছেন। সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী তাঁরা নিজ নিজ জেলা শিক্ষা আধিকারিকের মাধ্যমে আবেদনও জমা দিয়েছিলেন।
কিন্তু দীর্ঘ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই আবেদন গুলির অধিকাংশই কার্যত ফাইলবন্দি হয়ে রয়েছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শুধু শিক্ষকরা নন, ক্ষতির মুখে পড়ছে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাই।
শিক্ষাবিদদের মতে, যদি যোগ্যতা অনুযায়ী পদোন্নতির প্রক্রিয়া কার্যকর করা হতো, তাহলে বহু প্রাথমিক শিক্ষক স্নাতক শিক্ষক পদে এবং বহু স্নাতক শিক্ষক স্নাতকোত্তর শিক্ষক পদে উন্নীত হতে পারতেন। ফলে বিদ্যালয়গুলিতে বিষয়ভিত্তিক দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেত এবং ছাত্রছাত্রীরা আরও উন্নত মানের শিক্ষা লাভের সুযোগ পেত।
শুধু তাই নয়, এই পদোন্নতির ফলে বিপুল সংখ্যক নিম্নপদ শূন্য হয়ে যেত। সেই শূন্যপদগুলিতে নতুন নিয়োগের পথ খুলে যেত টেট উত্তীর্ণ এবং টেটের প্রস্তুতি নেওয়া হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীর জন্য।
অর্থাৎ একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন অভিজ্ঞ শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে পারত, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের চাকরিপ্রার্থীদের জন্যও কর্মসংস্থানের দরজা খুলে দিতে পারত।

কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো চিত্রই দেখা যাচ্ছে।
অভিযোগ উঠছে, শিক্ষা দপ্তরের একাংশের উদাসীনতা, অনীহা অথবা অদৃশ্য প্রশাসনিক স্বার্থের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ মেমো বাস্তবায়নের আলো দেখেনি। ফলে বহু বিদ্যালয়ে আজও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকট রয়ে গেছে। উচ্চ যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণ থাকা সত্ত্বেও অনেক শিক্ষক তাঁদের দক্ষতা অনুযায়ী শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করার সুযোগ পাচ্ছেন না।
শিক্ষক সংগঠন ও সচেতন মহলের প্রশ্ন, যদি সরকার নিজেই তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দিয়ে থাকে, তবে সেই তথ্যের ভিত্তিতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? কতজন শিক্ষককে সুবিধা দেওয়া হয়েছে? কতটি আবেদন এখনও নিষ্পত্তির অপেক্ষায়?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর আজও অজানা।
রাজ্যের শিক্ষার মানোন্নয়নের কথা যখন বারবার বলা হচ্ছে, তখন উচ্চশিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের প্রাপ্য মর্যাদা ও দায়িত্ব না দেওয়া এক ধরনের আত্মঘাতী নীতি বলেই মনে করছেন অনেকেই।
এখন দেখার বিষয়, শিক্ষা দপ্তর ও রাজ্য সরকার এই বহু বছরের পুরনো কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির দিকে নতুন করে নজর দেয় কি না। কারণ, এটি শুধু কয়েকজন শিক্ষকের পদোন্নতির প্রশ্ন নয়—এটি ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ, শিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থান এবং ত্রিপুরার সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
এদিকে, দুরন্ত টিভির অনুসন্ধানী দলের হাতে আসা তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে শিক্ষা দপ্তর সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের উচ্চতর যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রাপ্য সুবিধা ও পদোন্নতির বিষয়টি বিবেচনা করে একটি ফাইল আর্থিক অনুমোদনের জন্য অর্থ দপ্তরে পাঠিয়েছিল।

সূত্রের দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে সেই ফাইলের কোনও নিষ্পত্তি হয়নি। প্রশাসনিক মহলের একাংশের অভিযোগ, অর্থ দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা আকিঞ্চন সরকার নিজের ক্ষমতা বলে ফাইলটি বছরের পর বছর আটকে রেখে ছিল। সম্প্রতি সেই ফাইল পুনরায় শিক্ষা দপ্তরে ফেরত পাঠানো হয়েছে বলেও জানা গেছে।
আরও বিস্ফোরক অভিযোগ, তৎকালীন সচিব অতনু দেওয়ানজি এবং অর্থ দপ্তরের শীর্ষ পর্যায়ে থাকা আকিঞ্চন সরকারের চলা প্রশাসনিক মতপার্থক্য ও ঠান্ডা লড়াইয়ের বলি হয়েছিলেন রাজ্যের পদোন্নতির দাবিদার হাজার হাজার শিক্ষক।
সূত্রের দাবি, উচ্চশিক্ষিত শিক্ষকদের ন্যায্য সুযোগ ও পদোন্নতি কার্যকর হলে তার কৃতিত্ব অতনু দেওয়ানজির ঝুলিতে যেত। সেই কারণেই ফাইলটির অগ্রগতি ইচ্ছাকৃতভাবে থামিয়ে রাখা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনিক মহলে।
যদিও এই অভিযোগের বিষয়ে আকিঞ্চন সরকার বা অতনু দেওয়ানজি-র কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ২০১৯ সাল থেকে কেন এ ফাইল আটকে রয়েছে তার সঠিক তথ্য দিতে পারেনি দপ্তর।

প্রশ্ন একটাই—২০১৯ সালের সেই মেমো কি কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি অবশেষে বাস্তবায়িত হয়ে শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার এবং শিক্ষার্থীদের উন্নত শিক্ষার পথ প্রশস্ত করবে?
