ত্রিপুরার CHO নিয়োগ পরীক্ষায় নজিরবিহীন ‘নম্বর বিস্ফোরণ’! সোফেডের মূল্যায়নে নিট (NEET) কেলেঙ্কারির ছায়া এবার রাজ্যে

​নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, দুরন্ত টিভি:
জাতীয় স্তরের নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এবং একই সেন্টারে একাধিক পরীক্ষার্থীর এক নম্বর পাওয়ার বিতর্ক নিয়ে যখন দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে, ঠিক তখনই প্রায় একই ধরণের এক নজিরবিহীন অসঙ্গতির অভিযোগ উঠল খোদ ত্রিপুরা রাজ্যে। ন্যাশনাল হেলথ মিশন (NHM)-এর অধীনে কমিউনিটি হেলথ অফিসার (CHO) পদের নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে রাজ্যের নার্সিং চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে। গত ১৫ জুলাই ২০২৬ তারিখে এই পরীক্ষার ফলাফল ঘোষিত হতেই চোখ চড়কগাছ পরীক্ষার্থী থেকে শুরু করে শিক্ষামহলের।

অভিযোগ, একটি নেগেটিভ মার্কিংযুক্ত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় যে ধরণের নম্বর বণ্টন দেখা গেছে, তা পরিসংখ্যানগত এবং গাণিতিকভাবে সম্পূর্ণ ‘অস্বাভাবিক’ ও ‘অবাস্তব’। বোর্ডের পরীক্ষার মতো নম্বরের ছড়াছড়ি! সফেদের দেওয়া মার্কশীট অনুযায়ী ৯৮ নম্বর পেয়েছেন তিনজন। ৯৭.৭৫ নম্বর পেয়েছেন ১৯ জন। নেগেটিভ মার্ক যুক্ত পরীক্ষায় একই সংখ্যার নম্বর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

NEET পরীক্ষার মত করে CHO র জন্য রাজ্যের ছেলেমেয়েরা দিনরাত পরিশ্রম করে পরীক্ষা দিয়েছেন। এই ফল প্রকাশের পর বহু ছাত্র-ছাত্রী ডিপ্রেশনে চলে গেছেন বলে জানা যায়। চাকরি প্রার্থীদের অনেকের সোশ্যাল মিডিয়াতেও আত্মহনন বা অঘটনের মত পোস্ট দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে বিশালগরের এক মেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন বলে জানা যায়। যদিও তড়িঘড়ি হাসপাতালে নিয়ে তাকে এই যাত্রায় বাঁচানো যায়।

চাকরিপ্রার্থীদের অভিযোগ, এটি কোনো মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিকের বোর্ড পরীক্ষা নয় যে ঢালাও নম্বর দেওয়া হবে। অথচ সোফেড (SOFED) পরিচালিত এই নিয়োগ পরীক্ষায় ১০০-র মধ্যে প্রায় ২০১ জন পরীক্ষার্থী ৮০-র ওপরে নম্বর পেয়েছেন। শুধু তাই নয়, মেধা তালিকায় দেখা যাচ্ছে ১৯ জন পরীক্ষার্থী হুবহু ৯৭.৭৫ নম্বর পেয়েছেন! একই সাথে এসটি (ST) ক্যাটাগরির ১১ জন পরীক্ষার্থী অবিকল ৯১ নম্বর অর্জন করেছেন। ডেসিমেল বা দশমিকের ঘরে গিয়েও এত বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার্থীর একই নম্বর পাওয়া কোনো সাধারণ ঘটনা হতে পারে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

রাজ্যের চাকরিপ্রার্থীদের বক্তব্য, দেশজুড়ে নিট (NEET) দুর্নীতির ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছিল। নির্দিষ্ট কিছু সেন্টারে গাণিতিক সম্ভাবনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পরীক্ষার্থীরা একই রকম অস্বাভাবিক নম্বর পেয়েছিল। ত্রিপুরার মাটিতেও কি তবে কোনো অসাধু চক্র বা ‘কারিগরি কারসাজি’ কাজ করেছে? তদন্ত দরকার বলে দাবী উঠেছে।

রাজ্যের অন্যান্য বড় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা, যেমন— ত্রিপুরা পাবলিক সার্ভিস কমিশন (TPSC) কিংবা শিক্ষক যোগ্যতা নির্ধারণী পরীক্ষা (TET)-র দিকে তাকালেও দেখা যায়, সেখানে প্রতিটি নম্বরের ব্যবধানে পরীক্ষার্থীদের স্থান ও দশমিকের ঘর আমূল বদলে যায়। একটি পদের জন্য যেখানে হাজারো পরীক্ষার্থী লড়াই করেন, সেখানে একই দশমিক নম্বরে ১৯-২০ জন দাঁড়িয়ে থাকা চরম কারচুপির দিকেই ইঙ্গিত করে।

পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ, যদি এই পরীক্ষা সম্পূর্ণ স্বচ্ছভাবে হয়ে থাকে, তবে কর্তৃপক্ষ কেন লুকোচুরি করছে? কেন এখনও পর্যন্ত পরীক্ষার অফিশিয়াল Answer Key প্রকাশ করা হলো না? কেন পরীক্ষার্থীদের ওএমআর শিট (OMR Sheet) বা রেসপন্স শিট যাচাইয়ের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না?

ত্রিপুরার বর্তমান সরকার যেখানে “স্বচ্ছ নিয়োগ নীতি” ও মেধার মূল্যায়নের কথা বারবার বলে আসছে, সেখানে সোফেড (SOFED)-এর এই বিতর্কিত ফলাফল সরকারের ভাবমূর্তিকে কালিমালিপ্ত করছে বলে চাকরিপ্রার্থীদের অভিমত। মেধার এই চরম অবমাননা রুখতে এবং শত শত যোগ্য নার্সিং প্রার্থীর ভবিষ্যৎ বাঁচাতে অবিলম্বে মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করা হয়েছে।

পরীক্ষার্থীদের দাবি, অবিলম্বে এই ফলাফলের ওপর স্থগিতাদেশ জারি করে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক এবং প্রতিটি ওএমআর শিট পুর্নমূল্যায়ন করে নতুন স্বচ্ছ মেধা তালিকা প্রকাশ করা হোক। অন্যথায়, যোগ্যদের অধিকার ফিরিয়ে আনতে তারা বৃহত্তর আইনি ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!