নিজস্ব প্রতিবেদন, আগরতলা:
ধর্ষণের সংজ্ঞায় এক নতুন আইনি নজির গড়ল ত্রিপুরা হাইকোর্ট। গত সপ্তাহে ‘সুকান্ত মুড়াসিং বনাম ত্রিপুরা সরকার’ মামলায় নিম্ন আদালতের দেওয়া ১০ বছরের কারাদণ্ড খারিজ করে অভিযুক্তকে বেকসুর খালাস দিয়েছে হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ। বিচারপতি ড. টি. অমরনাথ গৌড় এবং বিচারপতি এস. দত্ত পুরকায়স্থের ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট করেছে যে, পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে হওয়া সম্পর্ককে বিচ্ছেদের পর ধর্ষণের মামলা হিসেবে গণ্য করা যায় না।
নিম্ন আদালতে অভিযুক্ত সুকান্ত মুড়াসিংয়ের বিরুদ্ধে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শারীরিক সম্পর্কের পর ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়েছিল। মামলাটি হাইকোর্টে উঠলে ডিভিশন বেঞ্চ পর্যবেক্ষণ করে যে, প্রসিকিউশন পক্ষ ভুক্তভোগীর সঙ্গে অভিযুক্তের শারীরিক সম্পর্কে ‘সম্মতির অভাব’ (Absence of consent) প্রমাণ করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেছে:
সম্পর্কটি দীর্ঘদিনের এবং পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল।
শারীরিক সম্পর্কের প্রকৃতি ও পরিণাম জেনেই ভুক্তভোগী স্বেচ্ছায় লিপ্ত হয়েছিলেন।
কেবল বিয়ের প্রতিশ্রুতি পালন না হওয়া বা সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া মানেই তাকে ফৌজদারি আইনে ‘ধর্ষণ’ হিসেবে গণ্য করা আইনত গ্রহণযোগ্য নয়।
আদালতের এই রায় আইনি মহলে ব্যাপক চর্চার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, যেখানে ‘ফলস প্রমিজ অফ ম্যারেজ’ বা বিয়ের মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে শারীরিক সম্পর্কের অভিযোগ নিয়মিত আসে, সেখানে হাইকোর্টের এই রায় স্পষ্ট করল যে—আইনের অপব্যবহার করে কোনো ব্যর্থ সম্পর্ককে ফৌজদারি অপরাধের রঙ দেওয়া উচিত নয়।

আদালতের পর্যবেক্ষণ:
সম্মতির ভিত্তি: আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, যদি কোনো সম্পর্ক দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয় এবং যদি দেখা যায় যে অভিযুক্তের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ ‘সম্মতিমূলক’ (Consensual), তবে সেই সম্পর্ককে পরবর্তীকালে বিচ্ছেদের কারণে ‘ধর্ষণ’ বলা যায় না।
প্রমাণের অভাব: আদালত দেখতে পায় যে, প্রসিকিউশন পক্ষ ধর্ষণের অপরিহার্য উপাদান—অর্থাৎ ‘সম্মতির অভাব’ (Absence of consent) প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং ভুক্তভোগীর বয়ানেই প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি স্বেচ্ছায় সম্পর্কের প্রকৃতি বুঝে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছিলেন।
পর্যবেক্ষণ: আদালত বলেছে, সামাজিক বিয়ে সম্পন্ন না হওয়ার কারণে একটি স্বাভাবিক পারস্পরিক সম্মতির সম্পর্ককে ধর্ষণের অভিযোগের রূপ দেওয়া আইনত গ্রহণযোগ্য নয়।
আদালত নিম্ন আদালতের সাজা বাতিল করে অভিযুক্ত সুকান্ত মুড়াসিংকে বেকসুর খালাস দিয়েছে।
আইনজীবীদের মতে, ‘ফলস প্রমিজ অফ ম্যারেজ’ বা বিয়ের মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দেখিয়ে করা মামলার ক্ষেত্রে এই রায় একটি মাইলফলক। এটি ব্যর্থ প্রেমের সম্পর্ককে আইনি অপব্যবহারের হাত থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করল।
ধর্ষণের সংজ্ঞায় এক নতুন আইনি নজির গড়ল ত্রিপুরা হাইকোর্ট। দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর যদি কেউ ধর্ষণের অভিযোগ আনেন, তবে তা সব সময় ধর্ষণের আওতায় পড়ে না—এমনই এক পর্যবেক্ষণ দিয়ে অভিযুক্তকে সসম্মানে বেকসুর খালাস দিল হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ।
