অভিযোগ সত্ত্বেও ফাইল গেল DoPT-এ, শাস্তির বদলে IAS পদোন্নতি! আকিঞ্চন সরকারকে ঘিরে বিস্ফোরক অভিযোগে তোলপাড় প্রশাসনিক মহল..

নিজস্ব প্রতিনিধি, দুরন্ত টিভি, আগরতলা:

রাজ্যের প্রশাসনিক মহলে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে আকিঞ্চন সরকারকে IAS পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়া ঘিরে ওঠা একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগকে কেন্দ্র করে। জমি কেলেঙ্কারি, আর্থিক দুর্নীতি, মুম্বাইয়ে ফ্ল্যাট কেনা থেকে শুরু করে অবসরপ্রাপ্ত অফিসারদের পুনঃনিয়োগে সিন্ডিকেট চালানোর মতো গুরুতর অভিযোগ উঠলেও, শেষ পর্যন্ত তাঁর নাম DoPT-এ পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
গত সোমবার প্রকাশিত ছয়জন আধিকারিকের তালিকায় আকিঞ্চন সরকারের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর থেকেই প্রশাসনিক অন্দরে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অফিসারদের একাংশের দাবি, অতীতে নামমাত্র অভিযোগে বহু TCS অফিসারের IAS পদোন্নতির ফাইল আটকে রাখা হলেও, আকিঞ্চন সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাঁর ফাইল “মুক্ত” করে দেওয়া হয়েছে। ফলে গোটা প্রশাসনিক ব্যবস্থায় নেতিবাচক বার্তা গিয়েছে বলেই মত সংশ্লিষ্ট মহলের।
অভিযোগ উঠেছে, DoPT-এ DPC রিপোর্ট পাঠানোর আগে তদন্ত কমিটির রিপোর্টে “কাটছাঁট” করা হয়েছে। উত্তর জেলা থেকে আসা জমি কেলেঙ্কারির রিপোর্ট পুনঃতদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল আকিঞ্চন সরকারের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী অরুণ কুমার রায়কে। সচিবালয় সূত্রের দাবি, “একজন আরেকজনকে বাঁচিয়ে চলেছেন।” এই আকিঞ্চন সরকারের বিরুদ্ধে জমি সংক্রান্ত মামলায় তদন্তের জন্য ২০২০ সালে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেবের নির্দেশ মূলে উনকোটি জেলার তৎকালীন জেলাশাসক রবীন্দ্র রিয়াং কে রেভিনিউ অফিসারের বিরুদ্ধে ডিসিপ্লিনারি একশন নেওয়ার জন্য প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি হিসেবে চিঠি লিখেছিলেন বরুন কুমার সাহু। সেই তদন্ত আজও ফাইল বন্দি। সেই চিঠির প্রতিলিপি তুলে ধরলাম।

সূত্রের আরও দাবি, FR-56 নিয়মকে উপেক্ষা করে অবসর গ্রহণের পরেও বারবার অরুণ কুমার রায়কে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পুনঃনিয়োগ করেছেন আকিঞ্চন সরকার। অভিযোগ, সেই অরুণ কুমার রায়ই আবার শনি ও রবিবারের মতো বন্ধের দিনেও ওভারটাইম করে উনকোটি জেলা থেকে আসা রিপোর্টে কাটছাঁট করে আকিঞ্চন সরকারকে “রক্ষাকবচ” দিয়েছেন। বন্ধের দিন ওভারটাইম খেটে কেন এই তৎপরতা—তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
প্রাক্তন এক IAS অফিসার দুরন্ত টিভিকে জানিয়েছেন, এত অভিযোগের পরেও চিফ সেক্রেটারির সহযোগিতা ছাড়া IAS পদ পাওয়া কার্যত অসম্ভব। তাঁর বক্তব্য, একমাত্র চিফ সেক্রেটারির সুপারিশেই UPSC-তে ফাইল অগ্রসর হতে পারে। আর সেই চিঠি জারি করাতে আকিঞ্চন সরকার কী কী পদক্ষেপ নিয়েছেন, তাও খুব শীঘ্রই প্রকাশ্যে আনা হবে।

দুরন্ত টিভির হাতে আসা একাধিক সূত্রের দাবি, গোটা রাজ্যে অবসরপ্রাপ্ত অফিসারদের পুনঃনিয়োগকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী “সিন্ডিকেট” গড়ে উঠেছে। অভিযোগ, আকিঞ্চন সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি টিম অবসরের এক-দু’মাস আগেই সংশ্লিষ্ট অফিসারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং আর্থিক চুক্তির ভিত্তিতে পুনঃনিয়োগের ব্যবস্থা করে দেয়। যাঁরা আর্থিক শর্তে রাজি হন না, তাঁদের পুনঃনিয়োগ হয় না বলেও অভিযোগ।

প্রাক্তন এক TCS অফিসার দুরন্ত টিভিকে জানান, তিনি এবং তাঁর এক সহকর্মী পুনঃনিয়োগের আবেদন করেছিলেন। তাঁদের কাছেও পুনঃনিয়োগ পাইয়ে দেওয়ার নামে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করা হয়েছিল বলে তাদের অভিযোগ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই অফিসারের পাঠানো মেসেজের স্ক্রিনশট আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম। যদিও দুরন্ত টিভি এই দাবির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করেনি।


এছাড়াও সচিবালয় সূত্রে বিভিন্ন নামে আরও বহু ই-মেল ও নথি পৌঁছেছে দুরন্ত টিভির কাছে। একসময়ের প্রভাবশালী অবসরপ্রাপ্ত এক TCS অফিসারের অভিযোগ, আকিঞ্চন সরকারের টিম অর্থের বিনিময়ে অবসরপ্রাপ্তদের একের পর এক পুনঃনিয়োগের ব্যবস্থা করছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—ত্রিপুরায় কি তবে ৬০ বছর বয়সে অবসর গ্রহণের সরকারি নিয়ম কার্যকর নয়? সরকার কি নিজেরাই নিজেদের আইন ভঙ্গ করছে?
প্রশ্ন উঠছে আরও একটি বিষয় নিয়ে—একজন অফিসার কীভাবে টানা ১৬ বছর একই জায়গায় কর্মরত থাকতে পারেন?

প্রাক্তন ওই TCS অফিসারের অভিযোগ, আকিঞ্চন সরকারকে ব্যবহার করে এক দুজন প্রভাবশালী মন্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে নিজের “অর্থের ভাণ্ডার” বৃদ্ধি করে চলেছেন। আকিঞ্চন সরকারকে সরিয়ে দিলে বহু গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যেতে পারে বলেই তাঁকে সরানোর সাহস দেখানো হচ্ছে না—এমনই অভিযোগ উঠছে প্রশাসনিক অন্দরে।
বাজারে এখন জোর চর্চা, কিছু প্রভাবশালী আমলা ও অবসরপ্রাপ্ত আমলাই মন্ত্রীদের কার্যত নিয়ন্ত্রণ করছেন ইদানিং। সেই তালিকায় অপূর্ব রায়, শুভেন্দু দাসগুপ্ত, দীপক দাশগুপ্ত ও এ কে ভট্টাচার্যের মতো নামও ঘুরে বেড়াচ্ছে প্রশাসনিক মহলে। অভিযোগ, অবসরপ্রাপ্তদের নিয়ন্ত্রণেই চলছে সচিবালয়ের বড় অংশ।
দুরন্ত টিভির আরও একটি সূত্র দাবি করেছে, গত তিন বছরে দুই প্রভাবশালী মন্ত্রী আকিঞ্চন সরকারকে ব্যবহার করে বিপুল অর্থসম্পদ গড়ে তুলেছেন। আর সেই কারণেই বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত না করে উল্টে তাঁকে IAS পদে পুরস্কৃত করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্য, “মন্ত্রীদের দুর্বলতা রয়েছে বলেই আকিঞ্চন সরকারকে সরানোর দুঃসাহস কেউ দেখাতে পারছেন না।”
সরকারি খাস জমি এবং বনদপ্তরের জমি বাঁকা পথে ডাইভার্শন করে দেওয়ার অভিযোগে ২০১৯ সালের ৮ আগস্ট দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য ঊনকোটি জেলা শাসককে জয়েন সেক্রেটারি হিসেবে চিঠি দিয়েছিলেন অজিত দেবনাথ। প্রথমে সেই জমি সংক্রান্ত মামলার নাম জড়িয়ে ছিল আকিঞ্চন সরকারের।

আরও বিস্ফোরক অভিযোগ উঠে এসেছে UPSC-এর সঙ্গে যোগাযোগ ঘিরে। দুরন্ত টিভির সূত্রের দাবি, UPSC-র সেক্রেটারি শশী রঞ্জন কুমারের কিছু “বেনামী বা বেহিসাবি কার্যকলাপের” গোপন তথ্য আকিঞ্চন সরকারের কাছে রয়েছে। সেই তথ্যকে হাতিয়ার করেই নাকি তিনি দীর্ঘ ১৬ বছর একই জায়গায় থেকে গিয়েছেন।
IAS শশী রঞ্জন কুমারকে ঘিরে থাকা সেই “গোপন রহস্যের” তিনটি প্রমাণ ইতিমধ্যেই দুরন্ত টিভির কাছে এসেছে। খুব শীঘ্রই পর্যায়ক্রমে সেই তথ্য প্রকাশ করা হবে। দুরন্ত টিভির হাতে একের পর এক সরকারী পুরোনো নথী কি করে আসছে সেটা জানতে সচিবলয়ে
চিরুনি তল্লাশি শুরু করছে আকিঞ্চন।

…ক্রমশ প্রকাশ্য হবে আরও বিস্ফোরক তথ্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!