“নকশালমুক্ত ভারতের পথে ঐতিহাসিক সাফল্য—বাস্তবায়নের দোরগোড়ায় কেন্দ্রের অঙ্গীকার” “৬ দশকের সশস্ত্র আন্দোলনের অবসান কি সত্যিই?

অমর নাথ, সংবাদ প্রতিবেদক, মুম্বাই:

নকশালমুক্ত ভারতের স্বপ্ন কি সত্যিই বাস্তবে রূপ নিতে চলেছে? কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঘোষিত ৩১ মার্চ ২০২৬-এর সময়সীমা সামনে রেখে দেশজুড়ে এখন এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে সরকারি পরিসংখ্যান এবং সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট—ভারত দীর্ঘদিনের নকশাল উগ্রবাদ দমনে এক ঐতিহাসিক সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে যেখানে নকশাল-প্রভাবিত জেলার সংখ্যা ছিল ১২৬, তা ২০২৫ সালের শেষে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩-এ। তাও ওই অঞ্চলগুলিতেও বড় কোনও নকশাল নেতৃত্ব আর সক্রিয় নেই বলে দাবি প্রশাসনের। ফলে নকশাল সহিংসতার অবসান এখন সময়ের অপেক্ষা বলেই মনে করা হচ্ছে।

একসময় ছত্তীসগড়, ঝাড়খণ্ড, মহারাষ্ট্র, অন্ধ্রপ্রদেশ ও বিহার জুড়ে বিস্তৃত ছিল তথাকথিত “রেড করিডোর”। সেখান থেকেই চালানো হত একের পর এক বড় হামলা। কিন্তু ২০১৪-র পর থেকে শুরু হওয়া কড়া অভিযান পুরো চিত্রটাই বদলে দিয়েছে। গত এক দশকে ৬০০-র বেশি আধুনিক থানার নির্মাণ, উন্নত রাস্তা, দ্রুত নিরাপত্তা বাহিনী পৌঁছানোর পরিকাঠামো—সব মিলিয়ে নকশালদের ঘাঁটি দুর্বল হয়ে পড়েছে।

শুধু কঠোর অভিযান নয়, আত্মসমর্পণকারী উগ্রবাদীদের জন্য পুনর্বাসন ও সম্মানজনক জীবনের সুযোগও তৈরি করেছে সরকার। ফলে বহু নকশালই মূল স্রোতে ফিরতে আগ্রহ দেখিয়েছেন। অন্যদিকে যারা এখনও সহিংসতার পথ ছাড়েনি, তাদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীকে (CAPF) পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।

ইতিহাস বলছে, ১৯৬০-এর দশকে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ অসন্তোষ থেকেই নকশাল আন্দোলনের সূচনা। পরে চীনের নেতা মাও সেতুং-এর আদর্শে প্রভাবিত হয়ে এটি রূপ নেয় সশস্ত্র বিদ্রোহে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দেশের একাধিক রাজ্যে এবং হয়ে ওঠে ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশেষ করে ২০০৪ সালে পিপলস ওয়ার গ্রুপ এবং মাওইস্ট কমিউনিস্ট সেন্টারের সংযুক্তির পর সহিংসতা আরও বেড়ে যায়। ২০১০ সালে ছত্তীসগড়ে ৭৬ জন সিআরপিএফ জওয়ানের মৃত্যু, ২০১৩ সালে মহেন্দ্র কর্মা হত্যাকাণ্ড—এসব ঘটনা নকশাল সন্ত্রাসের ভয়াবহতা সামনে এনে দেয়।

তবে নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে কৌশলগত পরিবর্তন ঘটে। ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি, শক্তিশালী গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এবং কেন্দ্র-রাজ্যের সমন্বিত অভিযান—এই তিনের সমন্বয়ে ধাপে ধাপে দুর্বল হয়ে পড়ে মাওবাদী সংগঠনগুলি।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৪-এর মধ্যে নকশাল সহিংসতায় প্রায় ৭০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। শুধু ২০২৪-২৫ সালেই প্রায় ২,৯০০ জন মাওবাদী আত্মসমর্পণ করেছেন, গ্রেপ্তার হয়েছেন ১,৯০০-র বেশি এবং সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন ৬০০-রও বেশি উগ্রবাদী। পাশাপাশি ২৮ জন শীর্ষ নেতা নিহত হওয়ায় সংগঠনের নেতৃত্ব কাঠামো কার্যত ভেঙে পড়েছে।

বর্তমানে ছত্তীসগড়ের মাত্র কয়েকটি এলাকায় সীমিত উপস্থিতি রয়েছে নকশালদের। বিহার, মধ্যপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা ইতিমধ্যেই নিজেদের নকশালমুক্ত ঘোষণা করেছে।

কেন্দ্র সরকার শুধু নিরাপত্তা অভিযানেই জোর দেয়নি—উন্নয়নের দিকেও নজর দিয়েছে সমানভাবে। প্রায় ১২,০০০ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ, ৬,৫০০-র বেশি মোবাইল টাওয়ার স্থাপন এবং ১,৮০০-র বেশি ব্যাংকিং পরিষেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, দীর্ঘ ছয় দশকের এই সহিংস অধ্যায়ের শেষ অধ্যায় লিখতে চলেছে ভারত। তবে চূড়ান্ত সাফল্যের জন্য এখনও নজর রাখতে হবে অবশিষ্ট অঞ্চলগুলির দিকে—কারণ শান্তি প্রতিষ্ঠার এই লড়াই শেষ হলেও, তার স্থায়িত্ব বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!