পুনর্নিয়োগপ্রাপ্ত অধিকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের জেরে ভিজিল্যান্সে নতুন বিতর্ক, SP জেরেমিয়া ডার্লংয়ের ইস্তফা ঘিরে রাজ্যজুড়ে জোর চর্চা, উঠছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

**ভিজিল্যান্স এসপির পদত্যাগপত্র ঘিরে প্রশাসনিক তোলপাড়, অধিকর্তার বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ। অবসরের পর এই নিয়ে পরপর সাতবার পুনঃনিযুক্তি প্রাপ্ত অফিসার অনিন্দ্য কুমার ভট্টাচার্যের দুর্নীতি এবার অফিসিয়ালি প্রকাশ্যে এলো। তার অনৈতিক কাজে সমর্থন না জানিয়ে, বরং অনৈতিক কাজের বিস্তারিত ঘটনাবলীর উল্লেখ করে চাকুরীতে ইস্তফা দিলেন পুলিশের এসপি পদ মর্যাদার এই সিনিয়র পুলিশ অফিসার**

নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা:
ত্রিপুরা পুলিশের ভিজিল্যান্স শাখার পুলিশ সুপার (এসপি) জেরেমিয়া ডার্লং চাকরি থেকে অব্যাহতি চেয়ে সাধারণ প্রশাসন (জি.এ.) দফতরে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি ওই চিঠির অনুলিপি পুলিশ মহাপরিচালক (ডিজিপি)-এর কাছেও পাঠিয়েছেন। ২০১০ ব্যাচের এই টিপিএস (TPS) অফিসারের আকস্মিক পদত্যাগের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে রাজ্য পুলিশ ও প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

পুলিশ সূত্রের দাবি, ভিজিল্যান্স শাখার অধিকর্তা তথা অবসরপ্রাপ্ত আইএএস কর্মকর্তা অনিন্দ্য কুমার ভট্টাচার্যের অনৈতিক কাজকর্ম নিয়ে মতবিরোধ এবং কর্মক্ষেত্রে তাঁর খারাপ আচরণই জেরেমিয়া ডার্লংয়ের পদত্যাগের অন্যতম প্রধান কারণ। অনিন্দ্য কুমার ভট্টাচার্যের দুর্নীতি ও অনৈতিক কাজের তথ্য এবার অফিসিয়ালি প্রকাশ্যে এলো। তার অনৈতিক কাজের প্রতিবাদে বিস্তারিত ঘটনাবলীর উল্লেখ করে চাকুরীতে ইস্তফা দিলেন পুলিশের এসপি পদ মর্যাদার এই সিনিয়র পুলিশ অফিসার।

জানা গেছে, উত্তর ত্রিপুরার কুমারঘাটের বেতছড়া এলাকার বাসিন্দা জেরেমিয়া ডার্লং ২০১০ সালে টিপিএস অফিসার হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। সম্প্রতি তিনি পদোন্নতি পেয়ে পুলিশ সুপার হন এবং উত্তর ত্রিপুরা জেলা থেকে বদলি হয়ে ভিজিল্যান্স শাখার এসপি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কর্মজীবনের মাত্র ১৬ বছর পূর্ণ হলেও তিনি দুটি অ্যাডহক পদোন্নতি লাভ করেছেন। তবে সেই পদোন্নতির পরও চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক মহলে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে।

এদিকে, রাজ্য প্রশাসনে অবসর-পরবর্তী পুনর্নিয়োগের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দুরন্ত টিভি সহ বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ধারাবাহিক সংবাদ হয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, অবসরপ্রাপ্ত আইএএস কর্মকর্তা অনিন্দ্য কুমার ভট্টাচার্য অবসরের পর পরপর সাতবার পুনর্নিয়োগ পেয়েছেন। সম্প্রতি অবসরের পর নামের শেষে “IAS” ব্যবহার করার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে আর. কে. পুর থানায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (BNS)-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় অভিযোগ জমা পড়েছে।

পূর্বে তিনি অগ্নিনির্বাপক দফতরের ডিরেক্টর পদের দায়িত্বে ছিলেন। তখনও তাঁর বিরুদ্ধে দমকল বিভাগের গাড়ি মেরামতের বিল সংক্রান্ত নানা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, বড় আকারের দমকল গাড়ির মেরামতের জন্য ছোট গাড়ির গ্যারেজ ব্যবহার করে লক্ষাধিক টাকার বিল দেখানো হয়েছে। এছাড়া বয়সজনিত কারণে তিনি অধস্তন কর্মকর্তাদের বক্তব্য পুরোপুরি শুনতে বা বুঝতে না পেরে তাঁদের সঙ্গে প্রতি মুহুর্তেই দুর্ব্যবহার করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সূত্রের দাবি, সম্প্রতি ভিজিল্যান্স শাখায় সাধারণ প্রশাসন (পি অ্যান্ড টি) দফতরের এক প্রাক্তন টিসিএস কর্মকর্তা, যিনি বর্তমানে আইএএস পদে রয়েছেন, তাঁর বিরুদ্ধে বেআইনি উপায়ে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ, পুনেতে কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তি, বড়জলায় ফ্ল্যাট এবং দক্ষিণ জেলায় সম্পত্তি ক্রয়ের অভিযোগ জমা পড়ে। পাশাপাশি রাজ্যের এক প্রাক্তন উচ্চপদস্থ আইএএস কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আগরতলায় ১১টি ফ্ল্যাটসহ বিপুল পরিমাণ অপ্রদর্শিত সম্পত্তির অভিযোগও দাখিল করা হয়।
অভিযোগকারী হিসেবে ‘এ. সরকার’ নামে এক ব্যক্তি লিখিত অভিযোগ জমা দেন। সেই অভিযোগের তদন্তের দায়িত্ব জি.এ. (এ আর) দফতর সাধারণত ভিজিল্যান্স শাখাকেই দিয়ে থাকেন। অভিযোগের অগ্রগতি নিয়ে এসপি জেরেমিয়া ডার্লং ভিজিল্যান্স অধিকর্তা অনিন্দ্য কুমার ভট্টাচার্যের সঙ্গে আলোচনা করতে গেলে অভিযোগে উল্লিখিত ব্যক্তিদের নাম দেখেই অধিকর্তা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন বলে সূত্রের দাবি।

এরপর কিছুদিন কেটে যায়, অভিযোগ রয়েছে, মামলার তদন্ত এবং অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে এসপি জেরেমিয়া ডার্লংকে যথাযথভাবে বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ না দিয়ে তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়। এই ঘটনার জেরেই তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

অন্যদিকে, পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পর ত্রিপুরা পুলিশের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা জেরেমিয়া ডার্লংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছেন। সূত্রের খবর, তাঁকে পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারের জন্য বোঝানোর চেষ্টা চলছে এবং তিনি শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনও করতে পারেন।

তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্য প্রশাসনে অবসর-পরবর্তী পুনর্নিয়োগ, ভিজিল্যান্সের কার্যপ্রণালী এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে আগেও প্রশ্ন আগেও উঠেছে। নতুন করে উত্থাপিত এই ইস্তফার ঘটনা অনিন্দ্য কুমার ভট্টাচার্যের বেআইনী কার্যকলাপ, অধস্তনদের দিয়ে গায়ের জোরে, শুধুমাত্র মৌখিক আদেশে (পড়ুন গালিগালাজে) নানা অনৈতিক কাজ করানোর যে সকল অভিযোগ বহু আগে থেকেই উঠে আসছে, সেই সব অভিযোগের সত্যতাকেই প্রমাণ করে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, অনিন্দ্য কুমার ভট্টাচার্যের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ এবং কর্মক্ষেত্রে তাঁর আচরণ এবার প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভেতরের সংকটকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!