পুনর্নিয়োগ পেলেও ‘IAS’ নন, অবসর প্রাপ্তদের IAS ব্যবহারে হতে পারে জেল জরিমানা, অভিযোগ প্রমানে বন্ধ হতে পারে অর্ধেক পেনশন।

বিশেষ প্রতিনিধি, আগরতলা, দুরন্ত টিভি:
অবসর গ্রহণের পর সরকারের বিশেষ কোনো পদে পুনর্নিয়োগ (Re-employment) পেলেই কি একজন আমলা পুনরায় তাঁর পূর্ণ ক্ষমতা ও ‘আইএএস’ (IAS) পরিচয় ফিরে পান? এই প্রশ্ন জনমনে। প্রশাসনিক ও আইনি মহলে এই প্রশ্নটি নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে ত্রিপুরাতেও। আইন বিশেষজ্ঞ ও আদালতের বিভিন্ন নজির স্পষ্ট বলছে— অবসরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একজন কর্মকর্তার ‘অল ইন্ডিয়া সার্ভিস’-এর সক্রিয় সদস্যপদ চিরতরে শেষ হয়ে যায়। এরপর পুনর্নিয়োগের মাধ্যমে তিনি সরকারের অধীনে নতুন কোনো চুক্তিভিত্তিক পদে দায়িত্ব পালন করতে পারেন সাময়িক, কিন্তু তিনি আর কর্মরত আইএএস কর্মকর্তা নন। ফলে তাঁর নামের পাশে বোর্ডে সরকারী নথিতে বা দরজায় শুধুমাত্র ‘IAS’ বা Retd IAS শব্দটির ব্যবহার আইনত ও প্রশাসনিক ভাবে সম্পূর্ণ ভুল এবং বিভ্রান্তিকর।

মোস্ট সিনিয়র প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, অবসরের পর কোনো কর্মকর্তা যদি সরকারি নথি, লেটারহেড, সরকারী ওয়েবসাইট, অফিস বা বাড়ির দরজার মধ্যে, সাইনবোর্ড বা সাধারণ মানুষের সামনে নিজেকে শুধুমাত্র ‘IAS’ হিসেবে পরিচয় দেন, তবে তা সম্পূর্ণ বে- আইনি বলে উল্লেখ রয়েছে আর্টিকেল ১৮ তে। কারন IAS আমজনতার মনে বিভ্রান্তি তৈরি করে যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এখনও পূর্ণ ক্ষমতা নিয়ে কর্মরত। এই প্রবণতা বন্ধ করতে দেশের উচ্চ আদালত এবং প্রশাসনিক স্তরে একাধিক কড়া নির্দেশিকা ও আইনি ধারা রয়েছে। অভিযোগ প্রমানে এই অপরাধে সাজাও হওয়ার নজির রয়েছে ভারতে।
এই IAS ব্যবহার নিয়ে কেরালা হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায় ও কর্ণাটকের একটি বিতর্ক গোটা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

এই বিষয়ে ভারতের আইনি ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নজির তৈরি হয়েছিল কেরালা হাইকোর্টের ‘কে. এস. প্রেমচন্দ্রন কুরুপ বনাম কেরালা রাজ্য সরকার (২০১২)’* মামলায়। কেরালা ক্যাডারের একজন অবসরপ্রাপ্ত আইএএস কর্মকর্তা অবসরের পর একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার ডিরেক্টর হিসেবে পুনর্নিযুক্ত হয়ে তাঁর অফিশিয়াল লেটারহেডে এমনকি চিঠির নিচেও ‘IAS’ বা ‘IAS (Retd.)’ ব্যবহার করছিলেন।
Kerala High Court-এর বিচারপতি এস. এস. সতীশ্চন্দ্রনের একক বেঞ্চ এবং পরবর্তীতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দেয়:
“সিভিল সার্ভিস কোনো শিক্ষাগত ডিগ্রি বা স্থায়ী সামাজিক উপাধি (Title) নয়, এটি কেবলই একটি নির্দিষ্ট চাকরি। অল ইন্ডিয়া সার্ভিসেস রুলস অনুযায়ী, চাকরি ছাড়ার বা অবসরের পর নিজের নামের সঙ্গে ‘IAS’ বা ‘IAS (Retd.)’ ব্যবহার করা অনুচিত ও অশোভন আচরণ (Conduct unbecoming of a retired officer)।”


ভারতের সংবিধানের ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্র কোনো নাগরিককে সামরিক বা শিক্ষাগত যোগ্যতা যেমন Doctor, Captain, Major, Professor ছাড়া অন্য কোনো ‘খেতাব’ বা ‘উপাধি’ দিতে পারে না। সিভিল সার্ভিস কোনো খেতাব নয়, এটি একটি চাকরিমাত্র। ফলে অবসরের পর এটিকে স্থায়ী উপাধি হিসেবে নামের আগে বা পরে ব্যবহার করার কোনো সাংবিধানিক অনুমতি নেই। অবসরের পর পুনঃ নিয়োগে নামের পাশে IAS বা Retd IAS ব্যবহার করলে হতে পারে জেল জরিমানা।

একইভাবে, ২০১৫ সালে কর্ণাটক ক্যাডারের অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত মুখ্য সচিব এম. এন. বিদ্যাসঙ্কর তাঁর লেটারহেডে নামের পাশে সংক্ষেপে ‘IAS (R)’ ব্যবহার করেছিল। তখন তীব্র আপত্তি তোলে কর্ণাটক সরকার এবং তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ফাইলটি আইন বিভাগে পাঠানো হয়। শেষে আদালতের নির্দেশে তিনি নামের শেষে আইএএস শব্দটি তুলে নিতে বাধ্য হন।

আইনজীবীদের একাংশের মতে, ভারতে সরাসরি এমন কোনো আইন নেই যা অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের নিজেদের অতীত পরিচয় হিসেবে বাড়ির সামনে ‘Retd. IAS’ বা ‘Former IAS’ লিখতে বাধা দেয়। কিন্তু, কোনো অবসরপ্রাপ্ত বা পুনর্নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যদি নিজেকে বর্তমান কর্মরত (Serving) আইএএস হিসেবে উপস্থাপন করেন বা সেই সুযোগ নিয়ে কোনো কাজ করেন, সরকারী নোটিফিকেশনে সই করেন বা কোন মামলা সংক্রান্ত বিষয়ে নামের শেষে IAS বা Retd IAS ব্যবহার করেন তবে তা বড় ধরনের ফৌজদারি অপরাধ। এতে ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখানোর মধ্যে পড়ে বলে IPC 170 যা বর্তমান BNS 204 ধারায় উল্লেখ রয়েছে।

ত্রিপুরাতেও অবসর গ্রহণের পরে বারবার পুনঃনিযুক্তি নিয়ে কোর্টের নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে নিজের নামের শেষে IAS ব্যবহার করে চলেছেন বারবার নিযুক্ত প্রাপ্ত অনিন্দ্য কুমার ভট্টাচার্য এবং প্রদীপ কুমার চক্রবর্তী।

এই ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে মূলত দুটি আইন এবং শাস্তির বিধান কার্যকর হতে পারে।

যদি কোনো অবসরপ্রাপ্ত আমলা নিজেকে কর্মরত আইএএস হিসেবে জাহির করে কোনো সরকারি সুযোগ-সুবিধা নেন, নথিপত্রে সই করেন বা সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন, তবে তা সরাসরি দণ্ডনীয় অপরাধ।
ভারতীয় দণ্ডবিধির (IPC) ১৭০ ধারা এবং বর্তমান নতুন ফৌজদারি আইন ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-র সংশ্লিষ্ট ২০৪ ধারা অনুযায়ী এটি একটি জামিন অযোগ্য অপরাধ।

এই অপরাধ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড, আর্থিক জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডই হতে পারে।

যদি কোনো কর্মকর্তা তাঁর লেটারহেড বা ভিজিটিং কার্ডে জেনেশুনে বিভ্রান্তিকর তথ্য বা কেবল ‘IAS’ বা Retd IAS লিখে কোনো ব্যবসায়িক বা ব্যক্তিগত ফায়দা তোলার চেষ্টা করেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা হতে পারে।
IPC-র ৪২০ ধারা (বর্তমানে BNS-এর ৩১৮ ধারা)।
প্রতারণার মাধ্যমে আর্থিক বা অন্য কোনো সুবিধা গ্রহণের অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ভারী জরিমানা হতে পারে।

ভারতের সংবিধানের ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদ (Article 18) অনুযায়ী, রাষ্ট্র কোনো নাগরিককে সামরিক বা শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়া অন্য কোনো স্থায়ী উপাধি দিতে পারে না। তাই সিভিল সার্ভিসকে ‘ডক্টর’ বা ‘প্রফেসর’ শব্দের মতো স্থায়ীভাবে নামের আগে বসানো যায় না।
প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী, অবসরের পর কোনো আমলা যদি তাঁর পরিচয় দিতেই চান, তবে সঠিক পদ্ধতি হলো— ব্র্যাকেটে বা নিচে স্পষ্টভাবে সাবেক পদ উল্লেখ করা। যেমন: “সাবেক সচিব, ভারত সরকার (অবসরপ্রাপ্ত)” বা “প্রাক্তন মুখ্য সচিব, ত্রিপুরা সরকার (অবসরপ্রাপ্ত), বা প্রাক্তন অর্থ সচিব (অবসরপ্রাপ্ত)। পুনর্নিয়োগের ক্ষেত্রে তিনি যে পদে চুক্তিভিত্তিক নিযুক্ত হয়েছেন (যেমন: উপদেষ্টা, সেক্রেটারি বা চেয়ারম্যান), কেবল সেই পদের নামই ব্যবহার করা আইনত বৈধ বলে উল্লেখ রয়েছে BNS 204 ধারায়।

BNS ২০৪ ধারার মূল কথা হলো, একজন ব্যক্তি যে সরকারি পদের অধিকারী নন, তিনি যদি নিজেকে সেই পদের অধিকারী হিসেবে জনগণের সামনে তুলে ধরেন, তবে তা অপরাধ। পি. কে. চক্রবর্তী বা এ. কে. ভট্টাচার্যরা যখন অবসরে গেছেন, তখন থেকেই অল ইন্ডিয়া সার্ভিসেস রুলস অনুযায়ী তাঁদের ‘সক্রিয় আইএএস ক্যাডার’ সদস্যপদ শেষ হয়ে গেছে। এখন পুনঃনিয়োগের পর তাঁরা কেবল সরকারের চুক্তিভিত্তিক ‘সচিব’ বা ‘বিশেষ সচিব’, বা অন্য কিছু। কিন্তু তাঁরা আর ‘কর্মরত আইএএস’ নন। নেমপ্লেটে ‘IAS’ লিখে রাখা আইনের চোখে সরাসরি ছদ্মবেশ ধারণ এবং সেটা গুরুতর অপরাধ বলে গন্য।

এছাড়া, পেনশনের নিয়ম (Death-cum-Retirement Benefits Rules) অনুযায়ী, কোনো অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এই ধরনের ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণিত হলে সরকার তাঁর মাসিক পেনশন আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে পারে। কেউ মামলা করলেই এই অপরাধে প্রাথমিক পর্যায়ে তাঁর বর্তমান পুনঃনিয়োগের চুক্তিটি তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করা হতে পারে এই ধারা অনুযায়ী।

আইনের চোখে অবসর প্রাপ্ত আমলা আর সাধারণ নাগরিকের মধ্যে কোনো তফাত নেই। তাই অবসরের পরেও ‘কর্মরত আমলা’ সেজে ক্ষমতার দাপট দেখানোর এই যে অনৈতিক মানসিকতা, তার রাশ টানার সময় এসেছে। অন্যথায়, আইনের ধারা অনুযায়ী বৃদ্ধ বয়সে জেলের খাঁচায় ঢোকা ছাড়া তাঁদের সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকবে না। এই নিয়ে মামলা হতে চলেছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!