“অবসর শেষে আবারও চেয়ার দখল!” পুনঃনিয়োগের নামে কি যোগ্য অফিসারদের পথ আটকে দেওয়া হচ্ছে?
নিজস্ব প্রতিনিধি, দুরন্ত টিভি, আগরতলা:
রাজ্যের প্রশাসনিক অন্দরমহলে এখন সবচেয়ে বেশি চর্চিত বিষয়—অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিকদের ধারাবাহিক পুনঃনিয়োগ। প্রশ্ন উঠছে, এই পুনঃনিয়োগ কি সত্যিই প্রশাসনিক প্রয়োজন, নাকি যোগ্য কর্মরত অফিসারদের প্রমোশন আটকে রেখে একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার প্রক্রিয়া?
প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, একের পর এক অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিককে গুরুত্বপূর্ণ পদে পুনঃনিয়োগ দেওয়ায় সচিবালয়ের ভেতরে তৈরি হয়েছে তীব্র অসন্তোষ। কারণ, এই ধরনের পুনঃনিয়োগের ফলে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত বহু সিনিয়র অফিসার প্রাপ্য পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পাশাপাশি নতুন নিয়োগের সুযোগও কমে যাচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীর ভবিষ্যতের উপর।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, পুনঃনিয়োগ কোনও “স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া” নয়। Fundamental Rule 56 অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীর অবসরের নির্দিষ্ট বয়স রয়েছে। সেই সীমা অতিক্রম করার পর পুনঃনিয়োগ শুধুমাত্র বিশেষ ও ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতেই করা যেতে পারে। কিন্তু যখন একই ব্যক্তিদের বারবার এক্সটেনশন দেওয়া হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—রাজ্যে কি সত্যিই যোগ্য অফিসারের অভাব পড়েছে?
সংবিধানের Article 14 এবং Article 16 সরকারি চাকরিতে সমান সুযোগ ও স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা দেয়। ফলে যদি দেখা যায়, কর্মরত যোগ্য অফিসারদের উপেক্ষা করে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের পুনর্বার চেয়ারে বসানো হচ্ছে, তাহলে সেটি “arbitrary administrative action” হিসেবেও আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে।

অনিন্দ্য কুমার ভট্টাচার্যের রিটায়ারমেন্ট ২০২২ সালে ঘোষণা
প্রশাসনিক মহলে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে অনিন্দ্য কুমার ভট্টাচার্য, শুভেন্দু দাস গুপ্ত এবং অরুণ কুমার রায়ের নাম। চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের ১১ বছর পরেও শুভেন্দু দাশগুপ্ত সচিবালয়ে বহাল। অভিযোগ, অবসরের পরও একের পর এক এক্সটেনশন নিয়ে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে বহাল রয়েছেন। অফিসার মহলের একাংশের দাবি, এই ধারাবাহিক পুনঃনিয়োগের ফলে বহু যোগ্য আধিকারিকের পদোন্নতি আটকে রয়েছে।


এ কে ভট্টাচার্যের প্রথম এবং দ্বিতীয় দফার পুনঃ নিয়োগ পত্র
আইন বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, এক্সটেনশন অর্ডার জারি হয়ে গেলেই সেটি চূড়ান্ত বা স্থায়ী অধিকার হয়ে যায় না। অধিকাংশ পুনঃনিয়োগ ও এক্সটেনশন চুক্তিভিত্তিক হওয়ায় সরকার চাইলে “public interest”, “administrative review”, “policy decision” কিংবা “irregularity in appointment process”-এর ভিত্তিতে সেই নিয়োগ বাতিল করতে পারে।
অর্থাৎ, সরকার যদি মনে করে—
- পুনঃনিয়োগে স্বচ্ছতা ছিল না,
- যোগ্য কর্মরত অফিসাররা বঞ্চিত হচ্ছেন,
- প্রশাসনিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে,
- অথবা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নিয়ম ভাঙা হয়েছে,
তাহলে এক্সটেনশন চলাকালীন অবস্থাতেও সেই নিয়োগ বাতিল করা সম্ভব।
প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার চাইলে Review Committee গঠন করে সমস্ত পুনঃনিয়োগ খতিয়ে দেখতে পারে। পাশাপাশি Finance concurrence, Cabinet approval, DoPT guideline এবং recruitment norms অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তাও পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে।


অনিন্দ্য কুমার ভট্টাচার্যের এবং চতুর্থ এক্সটেনশন লেটার
শুধু প্রশাসনিকভাবেই নয়, এই ধরনের পুনঃনিয়োগ High Court-এ Public Interest Litigation (PIL)-এর মাধ্যমেও চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব। কারণ, যখন পুনঃনিয়োগের ফলে কর্মরত অফিসারদের প্রমোশন বন্ধ হয়ে যায় এবং নতুন নিয়োগের সুযোগ কমে যায়, তখন সেটি বৃহত্তর জনস্বার্থের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
প্রশাসনের একাংশের বক্তব্য, অবসরপ্রাপ্তদের বারবার পুনর্বাসনের বদলে—
- কর্মরত সিনিয়র অফিসারদের পদোন্নতি দেওয়া,
- শূন্যপদে নতুন নিয়োগ করা,
- এবং প্রশাসনে তরুণ অফিসারদের সুযোগ তৈরি করাই হওয়া উচিত সরকারের অগ্রাধিকার।
কারণ, একটি সুস্থ প্রশাসনে “extension culture” নয়, বরং স্বচ্ছতা, মেধা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতাই হওয়া উচিত মূল ভিত্তি।
এখন প্রশ্ন উঠছে—রাজ্যে কি সত্যিই যোগ্য অফিসারের অভাব পড়েছে? হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতী চাকরির আশায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন, অথচ একই ব্যক্তিদের বারবার পুনঃনিয়োগ দিয়ে প্রশাসনকে “ব্যক্তিগত স্বার্থের ক্লাব”-এ পরিণত করার অভিযোগ উঠছে সরকারের অন্দর থেকেই।
এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে অনিন্দ্য কুমার ভট্টাচার্যের নাম। অভিযোগ, অবসর গ্রহণের পর এখন পর্যন্ত ছয় মাস অন্তর একের পর এক ছয়টি এক্সটেনশন নিয়ে সচিবালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন তিনি। প্রকাশ্যে কেউ মুখ না খুললেও, অফিসার মহলের একাংশের মধ্যে এই ধারাবাহিক পুনঃনিয়োগ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে সূত্রের দাবি। অবসর থেকে শুরু করে সর্বশেষ এক্সটেনশন পর্যন্ত একাধিক সরকারি নোটিফিকেশন এখন প্রশাসনিক মহলে ঘুরছে।
শুধু অনিন্দ্য কুমার ভট্টাচার্য নন, সচিবালয়ে পুনঃনিয়োগপ্রাপ্তদের তালিকায় আরও কয়েকটি নাম ঘুরছে প্রশাসনিক অন্দরে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন শুভেন্দু দাশগুপ্ত, GA(P&T)-এর দীপক দাসগুপ্ত, অতিরিক্ত সচিব অরুণ কুমার রায়, এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ম্যানপাওয়ারের ডিরেক্টর অসীম সাহা এবং দিল্লিস্থ ত্রিপুরা ভবনের জয়েন্ট কমিশনার রঞ্জিত দাস।
অন্দরমহলে আরও একটি আলোচনা জোরালো হচ্ছে—দেবযানি ম্যাডামকে ছাড়া নাকি অনিন্দ্য কুমার ভট্টাচার্য কার্যত অসহায়, এবং একাধিক শুনানি বা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় তাঁকে সঙ্গে রেখেই কাজ এগোনো হচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে। সেই কারণেই প্রশ্ন উঠছে—ত্রিপুরার Vigilance Department কেন কার্যত “শীতঘুমে”?
তবে এই অভিযোগগুলির স্বাধীন ও সরকারি যাচাই এখনও সামনে আসেনি। DURANTA TV-ও এই দাবিগুলির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।


অনিন্দ্য কুমার ভট্টাচার্যের পঞ্চম এবং ষষ্ঠ এক্সটেনশন লেটার
প্রশাসনের ভেতরে এখন আরেকটি কথাও ঘুরছে—“সর্ষের ভেতরেই ভূত।” অর্থাৎ, যে ব্যবস্থার দায়িত্ব তদারকি করার, সেই ব্যবস্থার ভেতরেই যদি প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থান তৈরি হয়, তাহলে নিরপেক্ষতা কতটা নিশ্চিত থাকে?
এই প্রেক্ষাপটে আরও একটি সংবেদনশীল প্রশ্ন সামনে আসছে—এই ধারাবাহিক পুনঃনিয়োগের পেছনে কি কোনও আর্থিক স্বার্থঘনিষ্ঠ সমীকরণ বা প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধার অদৃশ্য নেটওয়ার্ক কাজ করছে? এক প্রাক্তন সিনিয়র TCS অফিসারের একটি স্ক্রিনশট সেই ইঙ্গিতই বহন করছে বলে প্রশাসনিক মহলে আলোচনা চলছে। যদিও সেই দাবিরও স্বাধীন যাচাই এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
তবে প্রশাসনের ভেতরে একই নামের ঘনঘন পুনরাবৃত্তি এবং ধারাবাহিক এক্সটেনশন—এই প্রশ্নগুলিকে আরও জোরালো করে তুলছে।
ফলে প্রশ্ন এখন একটাই—পুনঃনিয়োগ কি সত্যিই প্রশাসনিক প্রয়োজন, নাকি ক্ষমতার করিডরে তৈরি হওয়া এক অদৃশ্য সুবিধার সংস্কৃতি?
আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই সামনে আসছে আরও বিস্ফোরক তথ্য।
এখন দেখার, সরকার কি পুনঃনিয়োগের এই বিতর্কিত সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রশাসনে নতুন ভারসাম্য আনতে পদক্ষেপ নেয়, নাকি একই চক্র চলতেই থাকে।
আসছে পরবর্তী পর্ব—“সর্ষের ভেতরের ভূত”, এবং সেই অদৃশ্য সমীকরণের কুণ্ডলীও প্রকাশ পাবে।
