“মিডিয়া আতঙ্কে আকিঞ্চন সরকার? নিজের চেয়ার বাঁচাতে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব তৈরির অভিযোগে আকিঞ্চন নিয়ে সরগরম মহাকরণ!”

নিজস্ব প্রতিনিধি, দূরন্ত টিভি ওয়েব, ২১ মে ২০২৬: দুরন্ত টিভির একের পর এক তথ্যভিত্তিক সংবাদের পর চাপে আকিঞ্চন সরকার — নিজের চেয়ার বাঁচাতে কি এবার মুখ্যমন্ত্রী ডঃ মানিক সাহার বিরুদ্ধেই ‘অভ্যন্তরীণ অপপ্রচার’? প্রশাসনিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য।
রাজ্যের প্রশাসনিক মহলে এখন সবচেয়ে চর্চিত নাম আকিঞ্চন সরকার। দীর্ঘদিন ধরে অর্থদপ্তরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বসে থাকা এই আমলাকে ঘিরে একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ সামনে আসতেই যেন ক্রমশ অস্বস্তিতে পড়েছেন তিনি। দুরন্ত টিভিতে ধারাবাহিকভাবে তথ্যভিত্তিক সংবাদ প্রকাশের পর থেকেই মহাকরণে তার আচরণ, গতিবিধি এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন।
দুরন্ত টিভির একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, সম্প্রতি নিজের অবস্থান রক্ষা করতে গিয়ে আকিঞ্চন সরকার নাকি খোদ মুখ্যমন্ত্রী ডঃ মানিক সাহার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বা বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা করছেন। অভিযোগ, নিজের চেয়ার আঁকড়ে রাখতে তিনি রাজ্যের এক প্রভাবশালী নারী নেত্রীর কোয়ার্টারে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য তুলে ধরেন।


সূত্রের দাবি, গত ১৫ মে বিকেল পৌনে চারটা নাগাদ আগরতলার ত্রিদেব দেবীর মন্দির চত্বরে একটি গোপন বৈঠক করেন আকিঞ্চন সরকার। এরপর রবিবার বিকেল ৫টা ২০ মিনিট থেকে রাজ্যের এক প্রভাবশালী নারী নেত্রীর কোয়ার্টারে দীর্ঘ সময় ধরে বৈঠক করেন তিনি। তার সঙ্গে ছিলেন টিসিএস সংগঠনের এক পদস্থ নেতৃত্বও।

সূত্র অনুযায়ী, ওই বৈঠকে আকিঞ্চন সরকার নাকি দাবি করেন—
“প্রভাবশালী নারী নেত্রীর কোয়ার্টারে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর নামে আবোল তাবোল লাগাচ্ছিলেন। সাথে ছিলেন টিসিএস সংগঠনের নেতৃত্বের কেউ একজন। ওই নেট টিসিএস নেতৃত্বকে সঙ্গে নিয়ে প্রভাবশালীন নারী নেত্রীর কাছে মায়া কান্না করছিলেন আকিঞ্চন সরকার। তিনি বলেন মুখ্যমন্ত্রীর লোভীর লোক আমার পেছনে লেগেছে, তারা সব তথ্য মিডিয়াকে দিচ্ছে, আমি ম্যানেজ না করলে এতদিনে সরকার ডুবে যেত, আমি অন্য অফিসারের দুর্নীতি প্রকাশ করাতে সব লোক আমার পেছনে লাগিয়েছে মানিক সাহা, আমি কোন দোষ করিনি, আগামী কিছুদিন এই আপনি আরো ভালো জায়গাতে যাবেন, ম্যাডাম আপনি আমাকে বাঁচান, ওই রাজ্যস্তরের প্রভাবশালী নারী নেত্রীর কোয়ার্টারে গিয়ে এমনি কথা বলছিলেন আকিঞ্চন সরকার। যদিও ওই নারী নেত্রী আকিঞ্চন সরকারের কুমিরের মায়া কান্নার বিষয়টা বুঝে তেমন পাত্তা দেননি। বিষয়টা তিনি দেখবেন বলে নামমাত্র ভাবে ছেড়ে দিলেন।

আমাদের সোর্সের নিরাপত্তার কারণে আমরা ওই সময়ের কথোপকথনের ভয়েস রেকর্ডিংটি প্রকাশ করতে পারছি না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে টিসিএস সংগঠনের কোন এক অফিসার নেতাকে সঙ্গ করে আকিঞ্চন সরকার যেভাবে গোষ্ঠী কোন্দল লাগাতে উঠে পড়ে লেগেছে তাতে আগামী দিনে ভয়ংকর রূপ নেবে যে বলার অপেক্ষা রাখে না।
ওই নারী নেত্রীর বাড়ি থেকে বের হওয়ার কিছুক্ষণ পর কদমতলী এলাকায় হাঁটতে হাঁটতে আরো দুজনের সাথে কথা বলতে দেখা যায় আকিঞ্চন সরকার এবং ওই টিসিএস অফিসার নেতাকে।

অভিযোগ, ওই বৈঠকে তিনি নিজেকে “ষড়যন্ত্রের শিকার” হিসেবে তুলে ধরে রাজনৈতিক সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করেন। যদিও সংশ্লিষ্ট নারী নেত্রী পুরো বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব দেননি বলেই দাবি সূত্রের। বিষয়টি দেখবেন বলে তিনি নামমাত্র প্রতিক্রিয়া দেন বলেও জানা গেছে।

দুরন্ত টিভির হাতে ওই সময়কার কথোপকথনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এলেও, সূত্রের নিরাপত্তার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট অডিও বা ভয়েস রেকর্ডিং প্রকাশ করা যাচ্ছে না।

এদিকে প্রশাসনিক মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে— কেন হঠাৎ এতটা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন আকিঞ্চন সরকার? কেন সচিবালয়ে নিয়মিত উপস্থিত না থেকে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন? অভিযোগ উঠেছে, কোনো সরকারি ছুটি না নিয়েই তিনি অনেককে বলে বেড়িয়েছেন যে তিনি “রাজ্যের বাইরে” ছিলেন।
সচিবালয় সূত্রে আরও দাবি, দুরন্ত টিভিতে একের পর এক সংবাদ প্রকাশের পর থেকেই আকিঞ্চন সরকারের আচরণে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আগে নিয়মিত অফিস করলেও এখন নাকি কাজে মন বসছে না তার। নিম্নস্তরের কর্মীরা ফাইল নিয়ে গেলে তাদের সঙ্গে খিটখিটে মেজাজে দুর্ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ। বহু গুরুত্বপূর্ণ ফাইল সই না করেই ফেরত পাঠানো হচ্ছে বলে ক্ষোভ বাড়ছে কর্মচারী মহলে।


অভিযোগ আরও গুরুতর। সচিবালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে অনৈতিক সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত বা কম গুরুত্বপূর্ণ যেসব ফাইল আগে খোলামেলাভাবে ঘুরত, এখন সেগুলো তালাবন্দি করে রাখা হচ্ছে বলে সূত্রটি জানায়। “আকিঞ্চন টিম” এখন নাকি বিশেষ কিছু ফাইল আড়াল করার চেষ্টায় ব্যস্ত— এমন অভিযোগও উঠছে।
সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে টিসিএস অফিসারদের প্রোমোশন নিয়ে। অভিযোগ, নিজের IAS প্রোমোশনের পথ পরিষ্কার করতেই প্রায় ৯৪ জন টিসিএস অফিসারের পদোন্নতি বছরের পর বছর আটকে রাখা হয়েছে। ২০০৭, ২০১০, ২০১১ ও ২০১২ বা ২০১৪ ব্যাচের বহু অফিসারের গ্রেড ওয়ান থেকে SSG পদে প্রোমোশন হওয়ার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি বলে ক্ষোভ ছড়িয়েছে অফিসার মহলে।
দুরন্ত টিভির কাছে আসা একাধিক তথ্য অনুযায়ী, আকিঞ্চন সরকার কায়দা করে নিজের স্বার্থে IAS বরুণ কুমার সাউ থেকে শুরু করে অভিষেক চন্দ্র সহ একাধিক অফিসারের প্রশাসনিক অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করেছেন বলে অভিযোগ। এমনকি অতনু দেওয়ানজিকে সরানোর পিছনেও ব্যক্তিগত স্বার্থ কাজ করেছে বলে সচিবালয় সূত্রে জানা যায়।
সূত্রের দাবি, অতনু দেওয়ানজি সহ আরও কয়েকজন টিসিএস অফিসার প্রয়োজনে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে প্রস্তুত রয়েছেন আকিঞ্চন সরকারের বিরুদ্ধে।
একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গ্রেড-টু টিসিএস অফিসার অভিযোগ করেছেন,
“আমার পরের অনেক অফিসার গ্রেড-ওয়ান ও SSG-তে প্রোমোশন পেয়ে গেছেন। অথচ আমি ২২ বছর ধরে একই জায়গায় পড়ে আছি। কারণ আমি দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলায় আকিঞ্চন সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে সরকারের পক্ষে কথা বলেছিলাম।” ওই টিসিএস অফিসার আরো জানায় যে, রাজ্য সরকার সম্প্রতি মনোহর বিশ্বাস নামে প্রধানমন্ত্রী পুরস্কারপ্রাপ্ত এক টিসিএস অফিসারকে চাকরি থেকে বহিষ্কারের পেছনে আকিঞ্চন সরকারের সম্পূর্ণ হাত রয়েছে। কারণ জমি সংক্রান্ত দুর্নীতি মামলায় মনোহর বিশ্বাস আকিঞ্চনের বিরুদ্ধে রিপোর্ট জমা দিয়েছিলেন। নারীরা যেমন কোন এক সময় ৪৯৮ ধারাকে হাতিয়ার করে পুরুষের উপর জুলুম করত ঠিক তেমনি আকীঞ্চন সরকার ৫০ উর্ধ বেশ কিছু টিসিএস এর উপর FR56(J) আইনকে হাতিয়ার করে তাদের চাকরি থেকে বহিষ্কারের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। যদিও বেশিরভাগ সময়ে কোর্টে গিয়ে ওই নির্দেশ বাতিল হয়। যেমনটা সদ্য হয়েছে টিসিএস অফিসার উত্তম বৈষ্ণবের ক্ষেত্রে। তাকেও চাকরি থেকে একই আইন প্রয়োগ করে বহিষ্কার করেছিল। পরবর্তীতে তিনি আদালতের নির্দেশে পুনরায় চাকরিতে যোগ দেন।

আরও অভিযোগ, টিসিএস অফিসারদের প্রোমোশন নিয়ে সরকার যে কমিটি গঠন করেছিল, সেই কমিটির অধিকাংশ সদস্য প্রোমোশনের পক্ষে রিপোর্ট জমা দিলেও সেই ফাইল মুখ্যমন্ত্রীর টেবিলে পৌঁছায়নি। প্রশাসনিক মহলের প্রশ্ন— কে আটকে রেখেছে সেই ফাইল?
এখানেই শেষ নয়। মহাকরণে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, নিজের IAS হওয়ার স্বার্থে আরও কয়েকজন সিনিয়র টিসিএস অফিসারের ক্যারিয়ার কার্যত ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
আরও বড় প্রশ্ন উঠছে আকিঞ্চন সরকারের চাকরি জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়েও। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০০৩ সালের পর থেকে তিনি ডিসিএম ছাড়া কখনো BDO, SDM, ADM বা মাঠপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেননি। অথচ দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে অর্থদপ্তরের মতো অত্যন্ত প্রভাবশালী জায়গায় কীভাবে তিনি বহাল তবিয়তে রয়েছেন, তা নিয়েও উঠছে তীব্র প্রশ্ন।
এদিকে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে একটি EWS সার্টিফিকেট ইস্যু ঘিরে। অভিযোগ, এক মহকুমা শাসক অফিসে ফোন করে নিজের আপন ভাগ্নির নামে অনৈতিকভাবে EWS সার্টিফিকেট পাইয়ে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেছিলেন আকিঞ্চন সরকার। যদিও সংশ্লিষ্ট পরিবার আর্থিকভাবে স্বচ্ছল এবং EWS-এর নির্ধারিত যোগ্যতার মধ্যে পড়ে না বলেই দাবি সূত্রের।
সব মিলিয়ে প্রশাসনিক মহলের একাংশের বক্তব্য— আকিঞ্চন সরকার এখন শুধু নিজের পদ ও প্রোমোশন বাঁচাতেই ব্যস্ত নন, বরং রাজ্যের উচ্চস্তরের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যেও কৌশলে বিভাজন তৈরি করার চেষ্টা করছেন। যেটা তিনি বাম আমলে করেছিলেন। নিজের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে গিয়ে অন্য অফিসারদের ক্যারিয়ার আটকে দেওয়া, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো এবং প্রশাসনিক ফাইল নিয়ন্ত্রণের অভিযোগে ক্রমশ চাপে পড়ছেন তিনি।
যদিও এই সমস্ত অভিযোগের বিষয়ে আকিঞ্চন সরকারের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি ফোন ধরেননি, এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তার আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলির স্বাধীন যাচাইও এখনও সম্পূর্ণভাবে সম্ভব হয়নি। তবে প্রশাসনিক অন্দরে যে ক্ষোভ ও চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে, তা এখন আর চাপা থাকছে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!