দুরন্ত টিভি প্রতিনিধি, আগরতলা :
রেজিস্ট্রি নেই, তবু দখলে কোটি টাকার ফ্ল্যাট, “ভোটার তালিকা থেকে ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রি— সবখানেই কি রহস্য?” “সরকারি নথিতেই অসঙ্গতি? প্রশ্নের মুখে উচ্চপদস্থ আধিকারিক” সম্পত্তির হিসেবেই বাড়ছে সন্দেহ” “একাধিক অভিযোগ, ইতিহাস তৈরী করে তবু ২০১১ সাল থেকে একই জায়গায় অক্ষত। কার আশীর্বাদে?”
ত্রিপুরা সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তা এবং অর্থ দপ্তরের অতিরিক্ত সচিব আকিঞ্চন সরকার-কে ঘিরে একের পর এক বিস্ফোরক প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনিক মহলে। সম্পত্তির ঘোষণাপত্র, আয়ের উৎস, রেজিস্ট্রি ছাড়া ফ্ল্যাট দখল, ভোটার তালিকায় একাধিক নাম— সব মিলিয়ে এখন সচিবালয়ের অন্দরেই জোর আলোচনা, “কোন শক্তিতে এত অভিযোগের পরেও অক্ষত রয়েছেন আকিঞ্চন সরকার?”

সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সব উৎস মিলিয়ে তিনি নিজের বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ২০ লক্ষ ৪৮ হাজার টাকা। ২০২৫ সালে সেই আয় দেখানো হয়েছে ২১ লক্ষ ৮৩ হাজার টাকা। মাসিক মোট বেতন দেখানো হয়েছে ১ লক্ষ ৮১ হাজার ৯৬০ টাকা।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—
এই আয়ের সঙ্গে একাধিক ফ্ল্যাট, সম্পত্তি ও সম্পদের বাস্তব চিত্রের মিল কোথায়?
নথিতে বেতনের বাইরে উল্লেখযোগ্য অন্য কোনও আয়ের উৎস নেই। নেই ব্যাংক সুদ, ভাড়া, বিনিয়োগ, শেয়ার, মিউচুয়াল ফান্ড বা সম্পত্তি থেকে সম্ভাব্য আয়ের স্পষ্ট বিবরণ। অথচ সরকারি কর্মচারীদের সম্পত্তি ঘোষণায় এসব তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক বলেই প্রশাসনিক মহলের মত।
আরও আশ্চর্যের বিষয়—
‘স্থাবর সম্পত্তি’ ঘোষণায় মোবাইল ফোনের হ্যান্ডসেট পর্যন্ত উল্লেখ আছে, কিন্তু ফ্ল্যাট থেকে কোনও আয় আছে কি না, তার কোনও ব্যাখ্যা নেই।
প্রশ্ন উঠছে—
ফ্ল্যাটগুলো কি বছরের পর বছর ফাঁকা পড়ে?
নাকি প্রকৃত আর্থিক তথ্য গোপন করা হয়েছে?
সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি করেছে পুনের নারহে এলাকার সিতাই কমপ্লেক্সের একটি ফ্ল্যাট। সরকারি নথিতে দাবি করা হয়েছে, ২০২১ সালে মাত্র ২৪ লক্ষ ৫০ হাজার টাকায় ফ্ল্যাটটি কেনা হয়েছে। সূত্রটি জানায় যে,
আকিঞ্চন বাবু যে জায়গায় ফ্ল্যাট কিনেছেন পুনের সেই জায়গায় ফ্ল্যাটের নূন্যতম দাম শুরু হয় ৮০ থেকে ৯০ লক্ষ টাকার মধ্যে
কিন্তু ২০২৫ সালের সম্পত্তি ঘোষণাতেও লেখা—
“রেজিস্ট্রি হয়নি, দখলে রয়েছে।”
অর্থাৎ প্রায় পাঁচ বছর ধরে একটি ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রি ছাড়াই “দখলে”!
এখানেই উঠছে একের পর এক আইনি প্রশ্ন—
রেজিস্ট্রি ছাড়া একটি সম্পত্তি বছরের পর বছর কীভাবে নিজের সম্পত্তি হিসেবে দেখানো হচ্ছে?
স্ট্যাম্প ডিউটি ও রেজিস্ট্রেশন ফি কি পরিশোধ করা হয়েছে?
প্রকৃত লেনদেনের অঙ্ক কি গোপন করা হয়েছে?
যদি সম্পূর্ণ মালিকানা না থাকে, তাহলে সরকারি ঘোষণায় সেই সম্পত্তি অন্তর্ভুক্ত করা হলো কীভাবে?

দামের অঙ্ক নিয়েও রয়েছে বড় অসঙ্গতি।
আগরতলার বড়জলায় ২০১৬ সালে কেনা আরেকটি ফ্ল্যাটের মূল্য দেখানো হয়েছে ২৮ লক্ষ টাকা, যার বর্তমান মূল্য ৩৯ লক্ষ টাকা।
অথচ তার ছয় বছর পরে, পুনের মতো ব্যয়বহুল শহরে কেনা ফ্ল্যাটের মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র ২৪ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা!
সচিবালয়ের একাংশে প্রশ্ন—
বড়জলার ফ্ল্যাট যদি পুনের চেয়েও “দামী” হয়, তাহলে বাজারমূল্য ও ঘোষিত মূল্যের মধ্যে এই বিস্ময়কর ব্যবধান কেন?
এখানেই শেষ নয়। এর আগেও আকিঞ্চন সরকার-এর বিরুদ্ধে তথ্য গোপনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল। অভিযোগ ছিল, সরকারি জমিকে ব্যক্তিগত জমিতে রূপান্তরের ঘটনায় তথ্য চেপে রেখে সরকারকে বিপুল রাজস্ব ক্ষতির মুখে ফেলা হয়েছিল। সেই ঘটনায় তৎকালীন উনকোটি জেলার জেলাশাসক বিভাগীয় প্রক্রিয়া শুরুর সুপারিশ করেছিলেন বলেও অভিযোগ।
কিন্তু প্রশ্ন—
সেই রিপোর্টের পরও ব্যবস্থা হলো না কেন?
কার ছত্রছায়ায় বারবার অভিযোগের পরও অক্ষত রয়েছেন এই আধিকারিক?
এবার সামনে এসেছে আরও বিস্ফোরক অভিযোগ।
অভিযোগ উঠেছে, আকিঞ্চন সরকার এবং তাঁর স্ত্রী সর্মিষ্ঠা ঘোষ-এর নাম শান্তিরবাজার এবং টাউন বড়দোওয়ালি— দুই বিধানসভার ভোটার তালিকায় রয়েছে। অভিযোগ আরও গুরুতর— দুই জায়গাতেই ভোট প্রদান করা হয়েছে।
যদি এই অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে তা শুধুমাত্র প্রশাসনিক গাফিলতি নয়— সরাসরি নির্বাচনী আইন ভঙ্গের অভিযোগ উঠতে পারে।
Representation of the People Act, 1950-এর ধারা ১৭ ও ১৮ অনুযায়ী, একজন ব্যক্তির নাম একাধিক নির্বাচনী এলাকায় অন্তর্ভুক্ত থাকা বেআইনি। একইসঙ্গে, একাধিক কেন্দ্রে ভোটদান নির্বাচনী অপরাধের আওতায় পড়তে পারে।
এখন প্রশ্ন উঠছে—
একজন সাধারণ নাগরিকের ক্ষেত্রে সামান্য নথিগত ভুলেও প্রশাসন কড়া পদক্ষেপ নেয়, তাহলে একজন উচ্চপদস্থ আধিকারিকের ক্ষেত্রে নীরবতা কেন?
দুই কেন্দ্রে নাম থাকলে নির্বাচন দপ্তর কী করছিল?
অভিযোগ সত্য হলে, এতদিন কোনও তদন্ত শুরু হয়নি কেন?
প্রশাসনের অভ্যন্তরে কি এমন কোনও “বিশেষ সুরক্ষা বলয়” কাজ করছে, যেখানে নির্দিষ্ট কিছু অফিসারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও আইন কার্যকর হয় না?
২০১১ সাল থেকে একই প্রভাব বলয়ে থেকে গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে টিকে থাকার রহস্য কী?
সচিবালয়ে এখন জোর আলোচনা—
স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে আকিঞ্চন সরকার-কে অবিলম্বে গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরানো হোক। প্রয়োজনে সাময়িক বরখাস্ত করে সম্পত্তির উৎস, ব্যাংক লেনদেন, কর নথি, ভোটার তালিকা, সম্পত্তির প্রকৃত বাজারমূল্য এবং রেজিস্ট্রি সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য খতিয়ে দেখা হোক।
কারণ প্রশ্ন এখন শুধু একজন অফিসারকে নিয়ে নয়,
প্রশ্ন প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতা, নির্বাচনী স্বচ্ছতা এবং আইনের সমান প্রয়োগ নিয়ে।
