রামমন্দিরের দানের টাকা চুরি, ১৮ হাজারি কর্মীর দেড় কোটির জমি: গায়েব কোটি কোটি টাকা, তদন্তে ৩ সদস্যের ‘সিট’


অযোধ্যা, উত্তরপ্রদেশ: কোটি কোটি ভক্তের আবেগ ও বিশ্বাসের রামমন্দিরে এবার বড়সড় আর্থিক কেলেঙ্কারির ছায়া। মন্দিরের ক্যাশ কাউন্টার থেকে ভক্তদের দেওয়া অনুদানের বিপুল টাকা গায়েব করার অভিযোগ উঠেছে। প্রাথমিক তথ্য ও সূত্রের খবর অনুযায়ী, আত্মসাৎ হওয়া অর্থের পরিমাণ প্রায় ৫ থেকে ৭.৫ কোটি টাকা। ঘটনার ভয়াবহতা আঁচ করে উত্তরপ্রদেশ সরকার তড়িঘড়ি ৩ সদস্যের একটি বিশেষ তদন্তকারী দল বা ‘সিট’ (SIT) গঠন করেছে। ইতিমধ্যেই রাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্টের দুই কর্মীকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে পুলিশ।


এই জালিয়াতি চক্রের তদন্তে নেমে যে সমস্ত তথ্য সামনে আসছে, তা রীতিমতো চমকপ্রদ। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, মূল অভিযুক্ত লবকুশ মিশ্র কিছুকাল আগেও এলাকায় সাধারণ গাড়ির মেকানিক হিসেবে কাজ করতেন। কোনোভাবে রামমন্দির প্রশাসনে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা বেতনের একটি চাকরি জুটে যায় তাঁর। আর এই চাকরি পাওয়ার পর থেকেই লবকুশের জীবনযাত্রায় অবিশ্বাস্য পরিবর্তন আসে। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে সম্প্রতি লবকুশের রুদাউলির বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। সেখান থেকে নগদ ১০-১২ লক্ষ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। এই তল্লাশির সময় অযোধ্যা পুলিশের কর্মকর্তাদের সাথে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন রাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাই।


তদন্তে জানা গেছে, আটক হওয়া দুই কর্মী মূলত মন্দিরের ক্যাশ কাউন্টারে অনুদানের টাকা গোনার দায়িত্বে ছিলেন। এই পদের অপব্যবহার করেই প্রতিদিনের জমা হওয়া ক্যাশ থেকে টাকা সরানো হতো বলে প্রাথমিক অনুমান তদন্তকারীদের। মাত্র ১৮-২০ হাজার টাকা বেতনের এক কর্মী সম্প্রতি অযোধ্যা সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ১.৫ কোটি টাকার জমি কেনেন। অন্যদিকে অপর এক কর্মীও প্রায় ৪০ লক্ষ টাকা দিয়ে জমি কেনেন বলে তথ্য মিলেছে। এছাড়া অভিযুক্তদের বাড়ি থেকে দামি গাড়ি ও বিলাসবহুল সামগ্রীর খোঁজ মেলায় তাঁদের আয়ের উৎস নিয়ে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে।
এদিকে, ১৮ হাজার টাকা বেতনের সামান্য দুই কর্মীর পক্ষে এত বড় জালিয়াতি একা করা সম্ভব নয় বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল ও অযোধ্যার সাধু সমাজ।

উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা সমাজবাদী পার্টি নেতা পবন পান্ডে সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন, এই দুর্নীতির পেছনে বড় কোনো প্রভাবশালী চক্র জড়িয়ে রয়েছে। সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবও এই অর্থ নয়ছয়ের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে পুলিশি তৎপরতার দাবি জানিয়েছিলেন। অযোধ্যার পুরোহিতরাও এই ঘটনার পেছনে থাকা ‘আসল মাথা’দের খুঁজে বের করার দাবি তুলেছেন।

আটক হওয়া দুই কর্মীকে বর্তমানে হেফাজতে নিয়ে ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ করছে SIT। তদন্তকারীরা জানার চেষ্টা করছেন:
১. ১৮ হাজার টাকার কর্মীর দেড় কোটি টাকার জমি কেনার উৎসে কারা রয়েছে?
২. ট্রাস্টের ভেতরে আর কোনো বড় কর্মকর্তা এই চক্রে জড়িত কি না?
৩. প্রতিদিনের ক্যাশ কাউন্টারের হিসাব কীভাবে বছরের পর বছর ধরে ফাঁকি দেওয়া হলো?

পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং সামগ্রিক অবস্থা খতিয়ে দেখতে গত পাঁচ দিনে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার অযোধ্যা পৌঁছান রামমন্দির নির্মাণ কমিটির চেয়ারম্যান নৃপেন্দ্র মিশ্র। তবে নিজেকে এই বিতর্ক থেকে সম্পূর্ণ দূরে রেখেছেন তিনি। নৃপেন্দ্র মিশ্র স্পষ্ট জানান, তিনি শুধুমাত্র রামমন্দিরের নির্মাণকাজ দেখার দায়িত্বে রয়েছেন, ট্রাস্টের আর্থিক লেনদেন বা প্রশাসনিক বিষয়ের সাথে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। আপাতত ধৃতদের হেফাজতে নিয়ে ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ করছে সিটের গোয়েন্দারা।

১৮ হাজার টাকার কর্মীর দেড় কোটি টাকার জমি কেনার আসল উৎস কী, লেনদেনের মাধ্যম কী ছিল এবং ট্রাস্টের ভেতরের কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এই চক্রের সাথে যুক্ত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোটি কোটি ভক্তের আবেগ ও বিশ্বাসের টাকা এভাবে লুঠ হওয়ার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়েছে সাধারণ মানুষের মনে। SIT-এর তদন্তের দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে আমজনতা। অন্যদিকে, রাজনৈতিক পারদ চড়িয়ে সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব এই অর্থ নয়ছয়ের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। বিরোধীদের লাগাতার চাপ ও ট্রাস্টের অনুরোধের পরেই নড়েচড়ে বসে প্রশাসন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!