খাবারের মোড়কে বিষ! ত্রিপুরাজুড়ে পত্রিকা বা পুরনো কাগজে খাদ্য পরিবেশন, “খাদ্য সুরক্ষা বিভাগ কি দেখছে না, নাকি দেখতে চাইছে না?”

নিজস্ব প্রতিনিধি I দুরন্ত টিভি I আগরতলা

ত্রিপুরার শহর থেকে গ্রাম, বাজার থেকে ফুটপাত, ছোট দোকান থেকে নামিদামি রেস্টুরেন্ট—খাবারের নিরাপত্তা নিয়ে এক উদ্বেগজনক বাস্তবতা প্রতিদিন চোখের সামনে ঘটছে। অথচ বিষয়টি নিয়ে যেন কোনও মাথাব্যথাই নেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের।

আগরতলার ব্যস্ততম এলাকাগুলিতে ফুটপাতের ডালপুরি-তরকারির দোকান, পুরি-সবজি বিক্রেতা, ফুচকার স্টল, ভিজে মটর-চানাচুরের ঠেলাগাড়ি কিংবা বিভিন্ন টিফিন সেন্টারে আজও অবাধে ব্যবহার হচ্ছে পুরনো খবরের কাগজ, ব্যবহৃত খাতা এবং বইয়ের পাতা। গরম তেলে ভাজা সিঙ্গারা, বেগুনি, চপ, ডালপুরি, চানাচুর, ভিজে মটর—সবকিছুই তুলে দেওয়া হচ্ছে এইসব কাগজের উপর।

শুধু ফুটপাত বা ছোট দোকান নয়, অভিযোগ উঠছে যে বহু নামিদামি রেস্টুরেন্ট ও ফাস্টফুড সেন্টারেও এগ রোল, চিকেন রোল, চাউমিন কিংবা অন্যান্য খাবারের সঙ্গে পুরনো সংবাদপত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পার্সেল নিতে গেলেও খাবারের মোড়ক বা অতিরিক্ত প্যাকেজিং হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে পুরনো পত্রিকা কিংবা খাতার পাতা। প্রশ্ন উঠছে, যেখানে সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের জন্য অতিরিক্ত মূল্য দিচ্ছেন, সেখানে এমন অস্বাস্থ্যকর পদ্ধতি কীভাবে এখনও চালু রয়েছে?

ত্রিপুরার শহর থেকে গ্রাম—প্রায় সর্বত্রই চোখে পড়ে এক উদ্বেগজনক চিত্র। আগরতলার ফুটপাতের টিফিন স্টল হোক বা অমরপুরের প্রসিদ্ধ মাশকলাই জিলেপির দোকান, ধর্মনগরের জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ হোক বা সোনামুড়ার ঝালমুড়ির ঠেলাগাড়ি, বিলোনিয়ার ডালভাজা কিংবা খোয়াইয়ের সিঙ্গারা—অধিকাংশ ক্ষেত্রেই খাবার পরিবেশন ও প্যাকেটজাত করা হচ্ছে পুরনো খবরের কাগজ, ব্যবহৃত বই-খাতা বা অন্যান্য অস্বাস্থ্যকর কাগজে। আরো ভয়ংকর পরিস্থিতি সমস্ত ফুচকার দোকানগুলোতে। সেখানেও কাগজের বদলে এককালীন বাটি ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হোক। ফুচকার দোকানের মালিকরা লোক দেখানো স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পরিবেশন করলেও হ্যান্ড গ্লাভস গুলো তারা দিনের পর দিন ব্যবহার করে যাচ্ছেন জল দিয়ে ধুয়ে।

অমরপুরের প্রসিদ্ধ মাশকলাই জিলেপি দোকানে তো ছোট বাচ্চাদের লেখা খাতাও বাদ দিচ্ছে না। উদয়পুরের বিভিন্ন মিষ্টির দোকান, বিলোনিয়ার জনপ্রিয় মাছ ভাজার দোকান, সাবরুমের মৈত্রী সেতুর রাস্তার ধারের খাবারের দোকান, বিশালগড়ের মহকুমা শাসক অফিসের সামনের টিফিন সেন্টার গুলো, তেলিয়ামুড়ার মূল বাজারের জলখাবারের স্টল, উদয়পুর মাতাবাড়ি সংলগ্ন রেস্টুরেন্ট কিংবা চড়িলামের ডালপুরীর দোকান—রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ভিন্ন ভিন্ন খাবারের সঙ্গে একই চিত্র দেখা যায়। কোথাও জিলেপি, কোথাও সিঙ্গারা, কোথাও চানাচুর, আবার কোথাও এগ রোল—কিন্তু মোড়ক হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে সেই পুরনো খবরের কাগজ বা বাচ্চাদের ব্যবহৃত খাতা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবাদপত্রে ব্যবহৃত কালি, রং এবং বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান সরাসরি খাদ্যের সংস্পর্শে এলে তা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। গরম খাবারের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। বিভিন্ন সময়ে এর সত্যতাও পাওয়া গেছে। খাবারের সঙ্গে মিশে যাওয়া এসব রাসায়নিক দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা, হজমজনিত সমস্যা এমনকি গুরুতর রোগের কারণও হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের দাবি।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই অনিয়ম কোনও গোপন বিষয় নয়। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ প্রকাশ্যে এই ধরনের প্যাকেজিং ও পরিবেশন দেখতে পাচ্ছেন। তাহলে খাদ্য সুরক্ষা বিভাগের নজরে কি বিষয়টি আসেনি? নাকি আইন থাকলেও তার প্রয়োগ কার্যত নেই? নাকি খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরে এসি রুমে বসে প্রতি মাসে বেতন গুনছেন আধিকারিকেরা।

খাদ্য সুরক্ষা ও মান নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার প্রতি বছর বিপুল অর্থ ব্যয় করে। বিভিন্ন সময়ে সচেতনতামূলক প্রচার, লাইসেন্সিং এবং পরিদর্শনের কথা বলা হলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—যদি রাজ্যের প্রায় প্রতিটি মহকুমা ও বাজারে একই ধরনের অনিয়ম চলে, তাহলে নজরদারির ব্যবস্থা কোথায়?

জনস্বাস্থ্য কোনও বিলাসিতা নয়, এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। কয়েক টাকার সস্তা মোড়কের জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

ত্রিপুরা সরকারের কাছে এখন সময়ের জোরালো দাবি—রাজ্যজুড়ে বিশেষ অভিযান চালিয়ে পুরনো খবরের কাগজ, ব্যবহৃত খাতা ও বইয়ের পাতায় খাদ্য পরিবেশন ও বিক্রি সম্পূর্ণ বন্ধ করা হোক। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের জন্য বাধ্যতামূলক নির্দেশিকা জারি, নিয়মিত পরিদর্শন এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

কারণ, আজকের একটি সিঙ্গারা বা এগ রোলের মোড়কে লুকিয়ে থাকতে পারে আগামী দিনের একটি বড় স্বাস্থ্য সংকট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!