স্টাফ রিপোর্টার | দুরন্ত টিভি |আগরতলা
ত্রিপুরা সরকারের আর্থিক শৃঙ্খলা, জবাবদিহিতা এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ভারতের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (CAG)-এর ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষের অডিট রিপোর্ট।
রিপোর্ট অনুযায়ী, ৩১ মার্চ ২০২৪ পর্যন্ত ₹৬৬.৯২ কোটি টাকার সঙ্গে সম্পর্কিত মোট ১,১৩৪টি Abstract Contingency (AC) Bill-এর বিপরীতে বাধ্যতামূলক Detailed Countersigned Contingency (DCC) Bill জমা পড়েনি। ফলে বিপুল অঙ্কের সরকারি অর্থ বছরের পর বছর ধরে অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

Central Treasury Rules-এর Rule 309 এবং Delegation of Financial Powers Rules, 2019 অনুযায়ী AC Bill-এর মাধ্যমে উত্তোলিত অগ্রিম অর্থ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে DCC Bill জমা দিয়ে সমন্বয় করা বাধ্যতামূলক। Rule 309 অনুসারে এক মাসের মধ্যে এবং DFPR-এর Rule 31(12)(v) অনুসারে ন্যূনতম ত্রিশ দিন, সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা।

কিন্তু CAG-এর পর্যবেক্ষণ বলছে, বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
অডিটে উঠে এসেছে, অনিষ্পন্ন ১,১৩৪টি বিলের মধ্যে ৩০৪টি বিল, যার আর্থিক মূল্য ₹২২.৮১ কোটি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের আগের সময়ের। কিছু ক্ষেত্রে ২০২১ সাল থেকেই বিলগুলি সমন্বয়হীন অবস্থায় রয়েছে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হল, CAG স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছে যে দীর্ঘদিন ধরে AC Bill সমন্বয় না করা এবং DCC Bill দাখিল না করা আত্মসাতের (misappropriation) ঝুঁকি সৃষ্টি করে। বলতে গেলে CAG ঘুরিয়ে আত্মসাতের কথাই উল্লেখ করেছেন।

প্রশ্ন উঠছে—সরকারি কোষাগার থেকে অর্থ উত্তোলনের পর যদি বছরের পর বছর তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব জমা না পড়ে, তবে নিয়ম মানা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা কী করছিলেন?
অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি অনিষ্পন্ন বিল রয়েছে Fire Service Organisation-এ ₹২৬.৭৬ কোটি এবং Relief & Rehabilitation Department-এ ₹১৯.২০ কোটি টাকা
এই দুই ক্ষেত্রেই প্রশাসনিক মহলে আলোচনায় উঠে আসছে প্রাক্তন IAS কর্মকর্তা অনিন্দ্য কুমার ভট্টাচার্যের নাম। সরকারি নথি অনুযায়ী তিনি বিভিন্ন সময়ে Revenue, Relief Rehabilitation & Disaster Management, Home Department (Fire & Emergency Services) সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্বে ছিলেন। শুধু তাই নয়, অবসর গ্রহণের পরও তিনি সাতবার মেয়াদ বৃদ্ধি (extension) পেয়ে এখনও সচিবালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল রয়েছেন।

সরকারি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী Revenue এবং Relief Rehabilitation & Disaster Management সংক্রান্ত অতিরিক্ত দায়িত্বও তাঁর ওপর ন্যস্ত ছিল। ফলে সংশ্লিষ্ট সময়কালে আর্থিক তদারকি ও প্রশাসনিক নজরদারির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
এদিকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে Fire Service Organisation-এ Special Secretary হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় বিভাগটি ₹৪৯৩.৯৩ লক্ষ অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় অনুদান (Excess Grant) লাভ করে, যার মধ্যে ₹১০০ লক্ষ Supplementary Grant-এর মাধ্যমে প্রদান করা হয়েছিল বলেও অডিট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

অন্যদিকে অর্থ দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করে আসছেন উপসচিব আকিঞ্চন সরকার। সচিবালয়ের অন্দরে এখন প্রশ্ন উঠছে—বছরের পর বছর ধরে বিপুল অঙ্কের AC Bill অনিষ্পন্ন থাকা, Utilisation Certificate জমা না হওয়া এবং আর্থিক জবাবদিহিতার দুর্বলতা সম্পর্কে অর্থ দপ্তর কতটা সক্রিয় ছিল?
সচিবালয়ের একাংশে ফিসফাস শুরু হয়েছে যে অনিন্দ্য কুমার ভট্টাচার্য এবং আকিঞ্চন সরকারের প্রশাসনিক সময়কালে এই আর্থিক অনিয়ম ও তদারকির ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরে চলতে পেরেছে। যদিও এই অভিযোগের পক্ষে এখনও পর্যন্ত কোনও সরকারি তদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়নি।

তবুও একাধিক মৌলিক প্রশ্নের উত্তর এখনও অধরা।
সমস্ত AC Bill কি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় ছিল?
DDO-দের কি নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে DCC Bill জমা দেওয়ার জন্য নির্দেশ জারি করা হয়েছিল?
ডিফল্টকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কি কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল?
স্মারক (Reminder) জারি হয়ে থাকলে তার Compliance Report কোথায়?
Departmental Review আদৌ হয়েছিল কি?
দায় নির্ধারণে কোনও বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে কি?
এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—Finance Department এতদিন নীরব কেন?

CAG-এর রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে শত শত কোটি টাকার সঙ্গে সম্পর্কিত হাজার হাজার Utilisation Certificate এখনও অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে। ফলে আর্থিক প্রতিবেদন ও সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় আরও গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত মিলছে।
₹৬৬.৯২ কোটি কোনও ছোটখাটো হিসাবগত ত্রুটি নয়। এটি জনগণের করের টাকা। সেই অর্থের ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ নির্ধারিত সময়ে উপস্থাপন না হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

প্রশ্ন আরও রয়েছে—যদি Rule 309 অনুযায়ী এক মাসের মধ্যে DCC Bill জমা বাধ্যতামূলক হয়, তবে শত শত বিল বছরের পর বছর অনিষ্পন্ন রইল কীভাবে? কেন অগ্রিম অর্থের সমন্বয় সম্পন্ন হলো না? সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল কি? যদি না হয়ে থাকে, তবে কেন?

এটি কি সুশাসন (Good Governance) এবং নৈতিক প্রশাসনিক আচরণের (Ethical Governance) এবং (Fiscal Prudence & Fiscal Disciplines) আর্থিক দূরদর্শিতা মৌলিক ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যখন দেশের সর্বোচ্চ অডিট সংস্থা CAG নিজেই আত্মসাতের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করছে, তখন জনগণকে আশ্বস্ত করার জন্য সরকার কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে যে প্রতিটি টাকা যথাযথভাবে হিসাবভুক্ত হয়েছে?
প্রশাসনিক মহলের মতে, এই প্রশ্নগুলির উত্তরই নির্ধারণ করবে এটি কেবল প্রশাসনিক অবহেলা, নাকি আর্থিক শাসনব্যবস্থার আরও গভীর সংকটের ইঙ্গিত।
অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ধারাবাহিক পুনঃনিয়োগ নিয়েও ইতিমধ্যে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সাতবার এক্সটেনশন পাওয়া অনিন্দ্য কুমার ভট্টাচার্যের বর্তমান দায়িত্বকে ঘিরে সরকারের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহলে। কেউ কেউ অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের পুনঃনিয়োগের বিষয়টিকে অন্যান্য রাজ্যের বিতর্কিত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলির সঙ্গেও তুলনা করতে শুরু করেছেন।

এখন নজর একটাই—CAG-এর এই গুরুতর পর্যবেক্ষণের পর সরকার কি নিরপেক্ষ তদন্ত, জবাবদিহিতা নির্ধারণ এবং আর্থিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে হাঁটবে নাকি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করে একই পদে বহাল রাখবে ?
