আগরতলা, দুরন্ত টিভি প্রতিনিধি:
গত ১৫ জুন, ২০২৬ তারিখে দুরন্ত টিভিতে প্রকাশিত অবসরপ্রাপ্ত আইএএস কর্মকর্তা অনিন্দ্য কুমার ভট্টাচার্যের ৬ষ্ঠ বারের পুনর্নিয়োগ সংক্রান্ত সরকারি নোটিফিকেশনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য নিয়ে প্রকাশিত অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদনের পর এবার আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে।
দুরন্ত টিভির হাতে আসা নথি অনুযায়ী, শুধু ২২ অক্টোবর, ২০২৫ সালের পুনর্নিয়োগ আদেশেই নয়, বরং ২৭ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে জারি হওয়া তাঁর ৭ম বারের পুনর্নিয়োগ সংক্রান্ত সরকারি নোটিফিকেশনেও একই ধরনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য অপরিবর্তিত অবস্থায় রাখা হয়েছে।

প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, ৭ম পুনর্নিয়োগের নোটিফিকেশনের প্রথম প্যারায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, পুনর্নিয়োগের মেয়াদ ১৫-০৪-২০২৬ থেকে পরবর্তী ছয় মাসের জন্য কার্যকর থাকবে। অর্থাৎ, পুনর্নিয়োগের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অথচ একই নোটিফিকেশনের দ্বিতীয় প্যারায় বলা হয়েছে, পরবর্তী আদেশ জারি না হওয়া পর্যন্ত শ্রী অনিন্দ্য কুমার ভট্টাচার্য জিএ (এআর) দপ্তরে দায়িত্ব পালন করবেন এবং অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ভিজিল্যান্স বিভাগের ডিরেক্টর পদেও বহাল থাকবেন।
এখানেই দেখা দিচ্ছে মৌলিক প্রশ্ন। যদি পুনর্নিয়োগের মেয়াদ নির্দিষ্টভাবে ছয় মাস হয়, তাহলে একই আদেশে আবার “পরবর্তী আদেশ না হওয়া পর্যন্ত” দায়িত্বে বহাল থাকার কথা কেন লেখা হল? একটি বক্তব্য যেখানে নির্দিষ্ট সময়সীমার কথা বলছে, অন্যটি কার্যত অনির্দিষ্টকাল দায়িত্বে বহাল থাকার সুযোগ সৃষ্টি করছে।

প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, একবার এমন অসঙ্গতি দেখা গেলে তাকে ক্লারিক্যাল বা ড্রাফটিং ত্রুটি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। কিন্তু একই ধরনের অসঙ্গতি যখন একাধিক পুনর্নিয়োগ আদেশে হুবহু পুনরাবৃত্তি হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এটি কি শুধুই ভুল, নাকি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কোনও গভীরতর সমস্যা?
কারণ, সরকারি প্রশাসনে একটি ভুল চিহ্নিত হওয়ার পর তা সংশোধনের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দপ্তরের। অথচ এখানে দেখা যাচ্ছে, ৬ষ্ঠ বারের পুনর্নিয়োগে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছিল, ৭ম বারের পুনর্নিয়োগেও প্রায় একই ভাষা ও একই ধরনের অসঙ্গতি বহাল রয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, পুনর্নিয়োগ সংক্রান্ত নোটিফিকেশন জারি করেছে জিএ (পি অ্যান্ড টি) দপ্তর এবং যে জিএ (এআর) দপ্তরে পুনর্নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, উভয় দপ্তরই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর অধীন। ফলে প্রশাসনিক তদারকি, নথি যাচাই ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। সেই ভুলের দায়ভার গিয়ে বর্তাবে মুখ্য সচিবের উপর। সচিবালয়ে কর্মরত অন্য আমলাদের বক্তব্য অনুযায়ী, মুখ্য সচিব ইচ্ছে করেই এমন ভুল বার বার করছেন নাকি ভুলের দিকে নজর দিচ্ছেন না?
আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা, যুক্তিসঙ্গততা ও নির্দিষ্টতা থাকা বাধ্যতামূলক। ভারতের সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে স্বেচ্ছাচারিতা পরিহারের নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একইসঙ্গে সরকারি আদেশে অস্পষ্টতা বা পরস্পরবিরোধী নির্দেশ প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্নও উত্থাপন করতে পারে।

উল্লেখ্য, Fundamental Rule (FR) 56 অনুযায়ী অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের পুনর্নিয়োগ সাধারণত নির্দিষ্ট শর্ত ও নির্দিষ্ট সময়সীমার ভিত্তিতে করা হয়। সেই কারণে পুনর্নিয়োগের মেয়াদ ও দায়িত্ব সম্পর্কে পরিষ্কার ও দ্ব্যর্থহীন ভাষা ব্যবহার প্রশাসনিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এখানেই উঠে আসছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তৎকালীন সময়ে অপূর্ব রায়ের স্বাক্ষরিত অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পুনর্নিয়োগ সংক্রান্ত নীতিমালায় নতুন প্রজন্মের কর্মকর্তাদের সুযোগ সৃষ্টি এবং অবসরপ্রাপ্তদের পুনর্নিয়োগ সীমিত রাখার যে উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়েছিল, তা কি বর্তমানে কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে?
একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ক্ষেত্রে একের পর এক পুনর্নিয়োগ, তার ওপর পুনর্নিয়োগের নথিতে ধারাবাহিকভাবে একই ধরনের অসঙ্গতি—এসব বিষয় এখন প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নীতিগত সামঞ্জস্য নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করছে।
প্রশ্ন উঠছে, এই নোটিফিকেশনগুলি জারির আগে কি যথাযথ আইনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছিল? ক্যাবিনেট অ্যান্ড কনফিডেনসিয়াল বিভাগ, জিএ (পি অ্যান্ড টি) বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা কি এই অসঙ্গতি সম্পর্কে অবগত ছিলেন? যদি অবগত থাকেন, তাহলে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি কেন? আর যদি অবগত না থাকেন, তাহলে প্রশাসনিক নজরদারির কাঠামো কতটা কার্যকর?
রাজ্যের সাধারণ মানুষ এখন জানতে চান—একই ধরনের অসঙ্গতি বারবার কীভাবে সরকারি নথিতে স্থান পাচ্ছে? এর দায় কার? এবং সবচেয়ে বড় কথা, এই বিষয়টি কি নিরপেক্ষ প্রশাসনিক বা আইনি পর্যালোচনার দাবি রাখে না?
এখন দেখার বিষয়, সরকার এই পুনরাবৃত্ত অসঙ্গতি নিয়ে কোনও ব্যাখ্যা দেয় কি না!
