গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস এ নাম উঠতে চলেছে ত্রিপুরার? অবসরের ২৬ বছর পরেও ডিরেক্টর পদে বহাল ৮৪ বছরের হেমন্ত কুমার প্রতিহারী!”

Duranta TV Web | Agartala | Tripura

ত্রিপুরার প্রশাসনিক ইতিহাসে কি তৈরি হচ্ছে এক নজিরবিহীন অধ্যায়?
নাকি আইনের চোখে ধুলো দিয়ে গড়ে উঠছে “অমর চাকরির সাম্রাজ্য”?

ত্রিপুরার স্টেট ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরি বা FSL-কে ঘিরে এখন জোর বিতর্ক। বিতর্কের কেন্দ্রে একটাই নাম — Hemanta Kumar Pratihari।
অভিযোগ, অবসর গ্রহণের প্রায় ২৬ বছর পরেও তিনি এখনও রাজ্যের ফরেনসিক ল্যাবের ইনচার্জ ডিরেক্টর পদে বহাল। শুধু তাই নয়, একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালিত National Forensic Sciences University-এর ত্রিপুরা ক্যাম্পাসের ডিরেক্টরের দায়িত্বও সামলাচ্ছেন।

প্রশ্ন উঠছে —
দেড়শো কোটির দেশে কি একজন মানুষই একমাত্র যোগ্য ব্যক্তি?
ত্রিপুরায় কি আর কোনও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ নেই?
নাকি এই পদ এখন ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে?

সূত্রের দাবি, অন্য একটি রাজ্য সরকারের চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর ২০০১ সালে FSL-এ যোগ দেন হেমন্ত কুমার প্রতিহারী। ২০০১ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত দায়িত্বে থাকার পর তাঁকে সরিয়ে TPSC-এর মাধ্যমে নতুন ডিরেক্টর নিয়োগ করা হয়। কিন্তু ২০১১ সালে আবারও প্রত্যাবর্তন। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত তিনি কার্যত “স্থায়ী ডিরেক্টর” হিসেবেই বহাল রয়েছেন।

এরপর ২০২১ সালে কেন্দ্রীয় ফরেনসিক বিশ্ববিদ্যালয় NFSU-র ত্রিপুরা ক্যাম্পাসেও অতিরিক্ত ডিরেক্টরের চার্জ পান।
অর্থাৎ, একই ব্যক্তি একসঙ্গে রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দুই প্রতিষ্ঠানের মাথায়!

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন —
কোন নিয়মে?
কোন অনুমোদনে?
কোন এক্সটেনশন অর্ডারে?

কারণ প্রশাসনিক মহলের একাংশের দাবি, বহু বছর আগে শেষ হয়েছে তাঁর সর্বশেষ এক্সটেনশন। তারপরও কীভাবে তিনি বহাল?

আরও বিস্ফোরক অভিযোগ, তাঁর প্রকৃত বয়স নিয়েও নাকি রয়েছে ধোঁয়াশা।
কাউকে বলছেন ৮২, কাউকে ৮৪, আবার কোথাও ৮৬।
সূত্রের দাবি, সরকারি নথিতে বয়স পরিষ্কার নয়, তবে আধার তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে তাঁর বয়স প্রায় ৮৪ বছর।

এখানেই শেষ নয়।
অভিযোগ উঠছে, তিনি নিজেকে “প্রফেসর” হিসেবেও পরিচয় দেন, যদিও সেই সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক শিক্ষাগত বা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়োগের তথ্য প্রকাশ্যে নেই।

আর এখানেই প্রশ্ন তুলছে একাডেমিক মহল —
যোগ্যতার স্বচ্ছতা কোথায়?
সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ার মর্যাদা কোথায়?

সূত্র আরও দাবি করছে, ফরেনসিক ল্যাবের বহু সায়েন্টিফিক অফিসারকে নিয়মিত NFSU-তে ক্লাস নেওয়ার জন্য পাঠানো হত।
অর্থাৎ, যাঁদের মূল কাজ হওয়ার কথা অপরাধ তদন্ত, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও কেস এক্সামিনেশন — তাঁদের ব্যবহার করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাজে।

অভিযোগ অনুযায়ী, সেই অফিসাররা একদিকে রাজ্য সরকারের পূর্ণ বেতন নিয়েছেন, অন্যদিকে NFSU থেকেও অতিরিক্ত ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত সম্মানী পেয়েছেন।

প্রশ্ন উঠছে —
একজন সরকারি কর্মচারী কি একই সময়ে দুই জায়গা থেকে আর্থিক সুবিধা নিতে পারেন?
এটি কি সার্ভিস রুলস ও আর্থিক নীতির পরিপন্থী নয়?

ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে —
এই পুরো ব্যবস্থার নেপথ্যে কার আশীর্বাদ কাজ করছে?

প্রশাসনিক মহলে জোর আলোচনা, সচিবালয়ের একাংশের “অদৃশ্য সুরক্ষা বলয়” এখনও তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
বিশেষ করে সহকারী সচিব Akinchan Sarkar-এর নাম ঘিরে উঠছে নানা প্রশ্ন।

সূত্রের দাবি, মুখ্যমন্ত্রী নাকি বহু আগেই তাঁকে সরিয়ে নতুন নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
কিন্তু সেই নির্দেশ বাস্তবায়ন হয়নি।
বরং অভিযোগ, ফাইল “টেবিলের নিচে চাপা” দিয়ে রাখা হয়েছে।

যদি সত্যিই মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ কার্যকর না হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই —
ত্রিপুরা কি নির্বাচিত সরকারের দ্বারা চলছে, নাকি কিছু অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের অদৃশ্য নেটওয়ার্কের দ্বারা?

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এই ধরনের পুনর্নিয়োগ সংস্কৃতি রাজ্যের তরুণ, যোগ্য ও মেধাবী অফিসারদের ভবিষ্যৎ আটকে দিচ্ছে।
যে পদে নতুন প্রজন্মের বিজ্ঞানী, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ বা অধ্যাপক উঠে আসার কথা, সেখানে বছরের পর বছর ধরে একই মুখ বসে থাকলে প্রশাসন কখনও আধুনিক হতে পারে না।

সরকারি দপ্তরে “এক্সটেনশন কালচার” এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে অবসর যেন আর অবসর নয় — বরং নতুন চাকরির শুরু!

দেশের বিভিন্ন মামলায় সুপ্রিম কোর্ট একাধিকবার পর্যবেক্ষণ করেছে যে, অবসরপ্রাপ্তদের লাগাতার পুনর্নিয়োগ প্রশাসনের স্বাভাবিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং নতুন প্রজন্মের পদোন্নতি ও সুযোগ আটকে দেয়। আদালত বারবার বলেছে, এক্সটেনশন ব্যতিক্রম হতে পারে, কিন্তু সেটিকে নিয়মে পরিণত করা যায় না।

তাহলে ত্রিপুরায় কেন এই ব্যতিক্রমই “স্থায়ী নিয়ম” হয়ে উঠছে?

আরও বড় প্রশ্ন —
ভারতের বড় বড় ফরেনসিক ল্যাব যেমন দিল্লি, হায়দরাবাদ, গুজরাট বা মহারাষ্ট্রে কি ৮৪ বছর বয়সেও কেউ ডিরেক্টর পদে বহাল আছেন?
অবসরের ২৬ বছর পরেও কি কোথাও এমন নজির আছে?

সমালোচকদের বক্তব্য,
“ইন্দিরা গান্ধী মারা গেছেন, দেশ চলেছে।
অটল বিহারী বাজপেয়ী ক্ষমতা ছেড়েছেন, দেশ চলেছে।
ডঃ মনমোহন সিং সরে গেছেন, দেশ চলেছে।
তাহলে একজন হেমন্ত প্রতিহারী সরে গেলে কি ত্রিপুরার ফরেনসিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে?”

বয়সের সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা, প্রযুক্তিগত আপডেট, ফিল্ড রেসপন্স ও প্রশাসনিক গতি — সবকিছুরই স্বাভাবিক পরিবর্তন আসে।
ফরেনসিক বিজ্ঞানের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর ক্ষেত্রে আধুনিক, প্রশিক্ষিত এবং সক্রিয় নেতৃত্ব অত্যন্ত জরুরি।

এখন ত্রিপুরার মানুষের প্রশ্ন একটাই —
আইন কি সবার জন্য সমান?
নাকি কিছু মানুষ সত্যিই আইনের ঊর্ধ্বে?

স্বচ্ছ তদন্ত হোক।
সব এক্সটেনশন অর্ডার প্রকাশ্যে আনা হোক।
সরকার জানাক — কোন নিয়মে ৮৪ বছরের এক ব্যক্তি এখনও দুই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষে বসে আছেন।

কারণ নীরবতা যত বাড়বে, বিতর্ক তত গভীর হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!